অধ্যাপক ডাঃ এম আমজাদ হোসেন:  আজকাল প্রায় প্রতিদিন রাতেই ঘুমাতে গেলে বা একপাশ হয়ে ঘুমাতে বা শুতে পারেন না। প্রচন্ড ব্যথা হয় বাম কাঁধে। ঘুমানোর শত চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত ঘুম না হওয়াতে হাহাকার করেন। অবশ্য এর শুরুটা হয়েছিল ৩ মাস বা তারও আগে। শুরুতে অল্প অল্প করে ব্যথা হত, বিশেষ করে কোন জিনিস হাতে উঠাতে গেলে বা কাঁধ ঘুরিয়ে পিঠ চুলকাতে গেলে ব্যথা অনুভূত হয় বেশি। তিনি ভেবে ছিলেন হয়ত অতীতে কোন আঘাত পেয়েছিলেন যা তিনি ভালভাবে খেয়াল করেন নি এটি তারই ফল। তারমত এ রকম সমস্যা আরও অনেকেরই আছে। মেডিকেল সাইন্সের ভাষায় যাকে বলা হয় ফ্রোজেন শোল্ডার।

সাধারনত মধ্য বয়সেই এই রোগ দেখা যায়। এটা হল কাধের এমন একটা রোগ যাতে ব্যাথার মাত্রাটা আস্তে আস্তে বাড়তে থাকে এবং এক সময় তা অসহনীয় হয়ে পড়ে। এমনকি কাঁধের নড়াচরাই অসম্ভব হয়ে পড়ে। মজার ব্যাপার হলো কোন রকম অপারেশন ছাড়াই শুধুমাত্র নির্দিষ্ট কিছু ব্যায়াম এর মাধ্যমে এটি আপনা আপনি ভাল হয়ে যায় যদিও কিছুটা সময় লাগে। কিন্তু ভুক্তভোগীরাই জানেন এর ফলে সৃষ্ট সমস্যা জীবনকে কতটা দূর্বীসহ করে তুলতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক সমীক্ষায় দেখা গেছে পঞ্চাশর্ধ মানুষের কাজে অনুপস্থিত থাকার কারন হিসেবে কোমর ব্যথা ও হাটু পড়েই তৃতীয় স্থানে আছে ফ্রোজেন শোল্ডার।

কারন: বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এর তেমন কোন কারন জানা যায়নি। তবে দেখা গেছে ডায়াবেটিস্, হাইপারলিপিডেমিয়া বা শরীরে অতিরিক্ত মেদ, হাইপার থাইরয়েড, হ’দরোগ ও প্যারালাইসিস রোগীদের মধ্যে ফ্রোজেন শোল্ডারের প্রকোপ বেশি। কাধের অস্থিসন্ধিতে যে পর্দা থাকে, তার দুইটি আবরন থাকে, একটি ভিতরে দিকে আরেকটা বাইরের দিকে। এই দুই আবরনের মাঝখানে কিছুটা ফাঁকা জায়গা থাকে, যেখানে এক ধরনের তরল পিচ্ছিল পদার্থ থাকে, যা কাঁধের মসৃন নড়াচড়ার জন্য জরুরী। এই রোগে উক্ত দুই পর্দার মাঝখানের জায়গা ও পিচ্ছিল পদার্থ কমে যায় ফলে কাধের নড়াচড়াও মসৃন ভাবে হয় না এবং প্রচুর ব্যথার সৃষ্টি করে। ব্যধা দিন দিন বাড়তে থাকে এবং এক সময় তা অসহ্য হয়ে পড়ে।

fo1

পরীক্ষা নিরীক্ষা:  পরীক্ষা করলে দেখা যায়, রোগীর কাধের নড়াচড়া বিশেষ করে হাত উপরের দিকে উঠানো এবং হাত ঘুরিয়ে পিঠ চুলকানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। কদাচিৎ কাধ কিছুটা শুকিয়ে যাবার মত মনে হতে পারে। এটা হয় ব্যথার কারনে দীর্ঘদিন আক্রান্ত কাঁধ ব্যবহার না করলে। কাঁধের এক্ররে করলে তা প্রায় স্বাভাবিক পাওয়া যায়। কোন কোন রোগীর ক্ষেত্রে সেখানে পূর্বে আঘাত ছিল বলে জানা যায়, তবে সেটা খুব গুরুত্বপূর্ন নয়। কিছু রোগীর ক্ষেত্রে হাত ঝি ঝি করা, শক্তি কম পাওয়া এমনকি পাশাপাশি হাত একদম উঠাতে না পারার মত লক্ষন দেখলে খুব সতর্কতার সহিত পরীক্ষা করা উচিৎ যে রোগটি ফ্রোজেন শোল্ডার নাকি। স্নায়ুরোগ জনিত কোন সমস্যা, নাকি অতীতের আঘাতের ফলে রোটেটর কাফের ছিড়ে যাওয়া জনিত কোন সমস্যা। সে ক্ষেত্রে চিকিৎসার ধরনও ভিন্ন হবে।

চিকিৎসা:  প্রথমতই রোগীকে আশ্বত করতে হবে যে, এটি খুব সাধারন একটি সমস্যা। বয়স্কজনিত সাধারন পরিবর্তন যেমন চুল পাকা, চামড়া কুচকানোর মতই হাড় ও অস্থিসন্ধিতেও সঠিক চিকিৎসা ও বিশেষ কিছু পরিবর্তন হয়ে থাকে, যা সাধারনত সঠিক ও বিশেষ কিছু ব্যয়ামের মাধ্যমে ভাল হয়ে যায়। রোগীকে সঠিক ভাবে বোঝানোর পাশাপাশি হালকা কিছু ব্যথানাশক দেওয়া যেতে পারে। এবং সরাসরি গুরুত্ব সহকারে ব্যায়ামগুলি দেখিয়ে দিতে হবে। ব্যয়াম বা ব্যথানাশকে কাজ না হলে, কাধের অস্থিসন্ধিতে স্টেরয়েড ইনজেকশন দিতে হবে তবে তা অবশ্যই একজন অর্থোপেডিক চিকিৎসকের তত্বাবধানে এটার ফল বেশ ভাল। এবং রোগীরাও অনেকসময় এটি নেওয়ার জন্য উদগ্রীব থাকেন। তবে ইনজেকশন দিলেও ব্যয়ামের কোন বিকল্প নাই ব্যয়াম সবমসয় চালিয়ে যেতে হবে।

খেয়াল রাখতে হবে, এটি দেওয়ার মত প্রয়োজনীয় দক্ষতা না থাকলে হিতে বিপরীত হতে পারে। এমনকি হাত অবশ হয়ে যেতে পাওে বা শুকিয়ে যেতে পারে। তাই যেখানে সেখানে চিকিৎসা নেওয়া উচিৎ নয়। একজন অর্থোপেডিক সার্জনই হলে এক্ষেত্রে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি। ফ্রোজেন শোল্ডার নামক অর্ধপঙ্গুত্ব নিয়ে আর বসবাস নয়। উপযুক্ত চিকিৎসা নিন এবং সুস্থ থাকুন।

অধ্যাপক ডাঃ এম আমজাদ হোসেন
চিফ কনসালটেন্ট
অর্থোপেডিক সার্জারী বিভাগ
ল্যাবএইড হাসপাতাল লিঃ
ধানমন্ডি, ঢাকা।

টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Note: All are Not copyrighted , Some post are collected from internet. || বিঃদ্রঃ সকল পোস্ট বিনোদন প্লাসের নিজস্ব লেখা নয়। কিছু ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহীত ।