‘পলিথিনে মোড়ানো গরম খাবার খেলে ক্যান্সার ও চর্মরোগের সংক্রমণ ঘটতে পারে’

অনলাইন ইওর হেল্‌থ ডেস্কঃ সম্প্রতি বৃষ্টিতে রাজধানীর রাজপথে জলাবদ্ধতা সৃষ্টির কারণে ‘পলিথিনের ব্যাপক ব্যবহার’ পরিবেশবাদীদের আলোচনার মুখ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা বলছেন, পলিথিনের ব্যাপক বিস্তারের কারণে পানি অপসারণের উত্সমুখগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতে রাজধানীতে সৃষ্টি হচ্ছে অসহনীয় জলাবদ্ধতা। বাড়ছে যানজট ও জনদুর্ভোগ। আজ থেকে তিন দশক আগেও ডাল, চিনি, লবণ, আটা-ময়দা, মসলা প্রভৃতি পণ্য মোদির দোকানে কাগজের ঠোঙায় বিক্রি করা হতো। মাছ ও মাংস বিক্রি করা হতো কলাপাতায়। তখন পলিথিনের এত প্রচলন ছিল না। এখন আর সেদিন নেই। নিত্যপ্রয়োজনীয় সব পণ্যই পলিথিনের ব্যাগে বিক্রি করা হয়। কারণ পলিথিন সহজলভ্য এবং দামও অত্যন্ত কম। দেশে পলিথিন ও পলিথিনজাত দ্রব্যসামগ্রীর ব্যাপক ও অপ্রয়োজনীয় ব্যবহারের জন্য জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে।

পলিথিনে মোড়ানো গরম খাবার খেলে ক্যান্সার ও চর্মরোগের সংক্রমণ ঘটতে পারে। পলিথিনে মাছ ও মাংস প্যাক করা হলে অবায়বীয় ব্যাকটেরিয়া সৃষ্টির কারণে এগুলো দ্রুত পচে যায়। এ থেকে সৃষ্ট ব্যাকটেরিয়া ত্বকে বিভিন্ন রোগের জন্ম দেয়। এমনকি ডায়রিয়া ও আমাশয় ছড়াতে পারে এসব ব্যাকটেরিয়া থেকে। পিভিসি ও অন্যান্য প্লাস্টিকজাতীয় আবর্জনা ৭০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার নিচে পোড়ালে ডাই-অক্সিনজাতীয় বিষাক্ত গ্যাস সৃষ্টি হয়, যা জন্মগত ত্রুটি, চর্মরোগ, ক্যান্সারসহ নানান মারাত্মক রোগ সৃষ্টি করে। উজ্জ্বল রঙের পলিথিনে রয়েছে সিসা ও ক্যাডমিয়ামজাতীয় ভারী পদার্থ, যার সংস্পর্শে এলে শিশুদের দৈহিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত ও চর্মপ্রদাহের সৃষ্টি হয়। পলিথিন ব্যাগ প্রকৃতিতে মিশে যেতে সময় লাগে কয়েকশ বছর। এক সমীক্ষা থেকে জানা যায়, ঢাকা শহরে প্রতিটি পরিবার প্রতিদিন গড়ে চারটি পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার করে। সে হিসাবে প্রতিদিন এক কোটিরও বেশি পলিথিন ব্যাগ মাত্র একবার ব্যবহার করে যেখানে সেখানে ফেলে দেয়া হয়। এগুলো দ্বারা নদী-নালা, খাল-বিল, ডোবা ইত্যাদি ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয় এবং সামান্য বৃষ্টি জলাবদ্ধতার প্রকোপ বাড়িয়ে দেয়।

পলিথিন অপচনশীল দ্রব্য বলে দীর্ঘদিন অবিকৃত অবস্থায় থেকে মাটিতে সূর্যালোক, পানি ও অন্যান্য উপাদান প্রবেশে বাধা দেয়। সহজে পচে না বলে মাটির উর্বরাশক্তি কমে যায়। উপকারী ব্যাকটেরিয়া বিস্তারে বাধা সৃষ্টি করে। পানিরোধক বৈশিষ্ট্য ও উপযুক্ত স্থানে না ফেলার কারণে পানি অপসারণে বাধা সৃষ্টি করে পলিথিন। আইনানুসারে সকল প্রকার পলিথিন শপিং ব্যাগের উত্পাদন, আমদানি, বাজারজাত, বিক্রি, বিক্রির উদ্দেশ্যে প্রদর্শন, মজুদ, বিতরণ, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে পরিবহন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর পরও পলিথিন নিষিদ্ধের আইন বাস্তবায়নে কার্যকরী কোনো পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ করছে পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো। তারা বলছে, পলিথিন নিষিদ্ধের বিদ্যমান আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। সেই সঙ্গে পলিথিনের বিকল্প হিসেবে পাটের ব্যাগ, কাপড়ের ব্যাগ ও কাগজের ব্যাগ ব্যবহারে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। রাজধানীসহ সারা দেশে প্রায় এক হাজার নিষিদ্ধ ঘোষিত পলিথিন তৈরির কারখানা আছে। এগুলোর বেশির ভাগই পুরান ঢাকাকেন্দ্রিক। ঢাকার পলিথিন ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে একাধিক প্রভাবশালী সিন্ডিকেট রয়েছে।

মিরপুর, কারওয়ানবাজার, তেজগাঁও, কামরাঙ্গীচর, টঙ্গিতে ছোট বড় বেশ কিছু কারখানা রয়েছে। যাত্রাবাড়ী থেকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা পর্যন্ত বুড়িগঙ্গার পাড় ঘেঁষে গড়ে উঠেছে শতাধিক কারখানা। এছাড়া চট্টগ্রামসহ জেলা শহরগুলোয় গড়ে উঠেছে অনেক পলিথিন কারখানা। জরুরি রফতানি কাজে নিয়োজিত লেখা ট্রাকে করে ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হচ্ছে নিষিদ্ধ পলিথিন। প্যাকেজিংয়ের ছাড়পত্র নিয়ে পলিথিন শপিং ব্যাগ তৈরি করে বাজারজাত করা হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী বছরে ৫০০ বিলিয়ন পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার হচ্ছে, যা প্রতি মিনিটে এক মিলিয়ন। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নভুক্ত দেশের সমুদ্রসৈকত, লেক ও নদীতে বছরে আট বিলিয়নেরও বেশি পলিথিন ব্যাগ জমা হচ্ছে। আমেরিকার বিভিন্ন রাজ্যে ও শহরের গ্রোসারি মার্কেটে এবং শপিংমলে পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ফলে সেখানে বর্তমানে প্রায় ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের পাটের ব্যাগের চাহিদা রয়েছে, যা আগামী পাঁচ বছরে ৫০ গুণ বৃদ্ধি পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ এ চাহিদার মাত্র ৩-৫ শতাংশ রফতানি করছে। পলিথিন নিষিদ্ধ আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন হলে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটবে এবং জলবায়ু  পরিবর্তন ঝুঁকি হ্রাস পাবে।

পাটের ব্যবহার বাড়বে এবং মাঠপর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। পাটের ব্যাগ আমেরিকায় রফতানির উদ্যোগ নেয়া হলে রফতানি আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি কৃষক পাট চাষে উত্সাহিত হবেন এবং ন্যায্য দাম পাবেন। বাংলাদেশ ফিরে পাবে সোনালি আঁশের হারানো গৌরব। চলতি বছরের শুরু থেকে সরকার খাদ্যশস্য, চিনি ও সারের ক্ষেত্রে পাটের বস্তা বা মোড়ক ব্যবহার বাধ্যতামূলক করলেও কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে প্রয়োগ হচ্ছে না সরকারের এই যুগান্তকারী আইন। পাটের বস্তা ব্যবহার না করে প্লাস্টিকের বস্তা ব্যবহার করার জন্য জেল-জরিমানার বিধান থাকলেও আইন অমান্যকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ বা জেল-জরিমানা করার বিষয়টি এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান হচ্ছে না। ২০০৩ সালের ৩ অক্টোবর পণ্যে পাটজাত মোড়ক ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা-সংক্রান্ত আইন পাস হয়। পরিবেশদূষণ ও পাটের ব্যবহার বৃদ্ধির লক্ষ্যে আইনটি কার্যকরের জন্য বিভিন্ন সময় খাদ্যপণ্য ও সিনথেটিক ব্যাগ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করেছে বিজেএমসি ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। তাদের স্বার্থের কথা বিবেচনা করে ২০১৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত আইনটির কার্যকারিতা শর্তসাপেক্ষে শিথিল করা হয়। ২০১০ সালের আইনে বলা হয়েছে, ‘এ আইন কার্যকর হওয়ার পর কোনো ব্যক্তি এর অধীনে প্রণীত বিধি দ্বারা নির্ধারিত পণ্য পাটজাত মোড়ক দ্বারা বাজারজাত ব্যতীত বিক্রয়, বিতরণ বা সরবরাহ করতে পারবেন না বা করার অনুমতি দিতে পারবেন না। এর অন্যথা হলে জেল ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হবে।’ ধান, চাল, গমের ক্ষেত্রে শতভাগ পাটের বস্তা ব্যবহার করতে হবে। দেশে উত্পাদিত ও আমদানি করা সব সারের মোড়কজাতে বাধ্যতামূলকভাবে ৫০ শতাংশ পাটের বস্তা ব্যবহার করতে হবে।

চিনির ক্ষেত্রেও ৫০ শতাংশ লেমিনেটেড পাটের বস্তা ব্যবহার করতে হবে। ১৯৮৭ সাল থেকে ভারতে এ আইন কার্যকর আছে। অথচ আমাদের দেশে তিন বছরেও আইনটি কার্যকর করা যায়নি। দেশের বিভিন্ন হাটবাজার ও ব্যবসাকেন্দ্র ঘুরলে দেখা যায়, প্রায় সব দোকানেই চাল, ডাল, ছোলা, চিনি, ভুট্টাসহ সব প্রকার পণ্য সাজিয়ে রাখা হয়েছে প্লাস্টিকের বস্তায়। পাটের বস্তা চোখেই পড়ে না। ব্যবসায়ীদের কথা— পাটের চেয়ে প্লাস্টিকের বস্তার দাম অনেক কম ও সহজলভ্য। তাই তারা প্লাস্টিকের বস্তা ব্যবহার করেন। একটি পাটের বস্তার দাম যেখানে ৬০ টাকা, সেখানে প্লাস্টিকের বস্তা মাত্র ২০ টাকা। পলিথিন ও প্লাস্টিক বাতাস, মাটি ও পানিসহ গোটা পরিবেশকে দূষিত ও মাটির উর্বরাশক্তি হ্রাস করছে। জলাবদ্ধতা ও জলবায়ু পরিবর্তন ঝুঁকি বৃদ্ধি করে বিপন্ন করে তুলছে বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকা। এ বিষয়টি ব্যবসায়ীদের আন্তরিকভাবে উপলব্ধি করতে হবে। অন্যথায় প্লাস্টিক-পলিথিনদূষণের কারণে একসময় বসবাসের অনুপযোগী হয়ে যাবে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি। তাই পলিথিন ও প্লাস্টিক ব্যাগ উত্পাদন ও ব্যবহার বন্ধের ব্যাপারে দেশের সবাইকে আরো সচেতন হতে হবে এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে কঠোর ভূমিকা পালন করতে হবে। মনে রাখতে হবে পরিবেশ উপযোগী না হলে কোনো উন্নয়নই টেকসই হয় না এবং দেশ, জাতি ও অর্থনীতির জন্য সুদূরপ্রসারী কল্যাণ বয়ে আনে না।

লেখক: ডিজিএম
সেতাবগঞ্জ সুগার মিলস লিমিটেড, দিনাজপুর

টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Note: All are Not copyrighted , Some post are collected from internet. || বিঃদ্রঃ সকল পোস্ট বিনোদন প্লাসের নিজস্ব লেখা নয়। কিছু ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহীত ।