ac

অধ্যাপক ডাঃ এম আলমগীর চৌধুরী:  হঠাৎ  শ্রবণশক্তি লোপ পাওয়ার কারণে আমাদের কাছে আসেন  মোঃ আব্দুস সালাম বয়স ৬০ বৎসর,। আমরা পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখি উনি ভাইরাস জনিত কারণে দুই কানে শতকরা ৬০ ডেসিবল শ্রবণশক্তি হারিয়েছেন। ওনাকে আমরা কানে হিয়ারিং এইড ব্যবহারের পরামর্শ দিই। কিন্তু উনি হিয়ারিং এইড ব্যবহার করতে লজ্জা পান, ঔষধের মাধ্যমে চিকিৎসা চান। আব্দুস সালামের চিকিৎসা হল কানে শোনার যন্ত্র ব্যবহার করা, যাতে উনি স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারেন এবং দৈনন্দিন কাজকর্ম করতে পারেন। হিয়ারিং এইড ব্যবহারে লজ্জার কিছু নেই। আমরা চোখে যেমন চশমা ব্যবহার করি, সেরকম কানে কম শোনার একটা চিকিৎসা হল হিয়ারিং এইড ব্যবহার করা।

শ্রবণশক্তি হারানোঃ আমাদের সামজিক পারিপার্শ্বিক এবং যোগাযোগের ক্ষেত্রে শ্রবণশক্তি অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রতিদিন ঘরে বাইরে আমাদের অনেক মানুষের সম্মুখীন হতে হয়, এর মধ্যে খুব কম মানুষ শ্রবণ সুরক্ষাকারী যন্ত্র পরে অথবা শ্রবণ বিশেষজ্ঞের কাছে যায়। শ্রবণশক্তি হারানো যেকোন বয়সেই হতে পারে। বয়স বাড়লে আমাদের শরীর বৃত্ত অনেক কিছু পরিবর্তন হয় তার মধ্যে শ্রবণশক্তি অন্যতম। শ্রবণশক্তি হারনো মানে শুধু উচ্চ শব্দ শুনতে না পারা নয়। এর অর্থ হল কোন কিছু বোঝা এবং বিভিন্ন কথার শব্দকে পার্থক্য করতে না পারা। যদি শ্রবণশক্তি হারানো চিকিৎসা না করা হয় অথবা দেরি হয় তাহলে শিশুদের কোন কিছু জানার ক্ষমতা, ভাষা দক্ষতা এবং বিকাশ করার ক্ষমতা কমে যায়। শ্রবণশক্তি হারানো মানুষকে বিচ্ছিন্ন, দূর্বল, একাকীত্ব করে দিতে পারে। কানে শোনার ক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণে ভাব প্রকাশ করার ক্ষমতা কমে যেতে থাকে এবং সাথে সাথে বুদ্ধি এবং মানসিক ত্রুটি দেখা যায় যা শিশুদের স্কুলে অথবা যেকোন বয়সের মানুষের কর্মস্থল এবং সামাজিক কার্যকলাপে সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। শ্রবণশক্তি হারানো মানুষের জীবনে অনেক প্রভাব বিস্তার করে।

 শ্রবণশক্তির হারানোর গুরুত্বপূর্ণ কারণগুলো হলঃ

১)    বয়স প্রাপ্ত

২)    ব্যাকটেরিয়া অথবা ভাইরাস সংক্রমণ

৩)    দীর্ঘ দিন উচ্চ শব্দে থাকা

৪)    কানে ময়লা জমা হয়ে কান বন্ধ হয়ে যাওয়া

৫)    কানে ফাংগাল ইনফেকশন

 অন্যান্য কারণঃ

১)    জন্মগত ত্রুটি

২)    কানে আঘাত

৩)    বংশগত কারণ

৪)    কানে ক্ষতিকর কিছু ঔষধ

৫)    কানের বা ব্রেইনের টিউমার

৬)    অন্যান্য আরো কারণ

উচ্চ শব্দ আমদের জন্য ক্ষতিকরঃ  কখন শব্দ উচ্চ শব্দ হিসেবে প্রতিপন্ন হয় তা নির্ভর করে একেক জনের শ্রবণ শক্তির উপর ভিত্তি করে। যখন শব্দ অস্বচ্ছন্দ হয় বা কানে বিরক্ত লাগে, তখনই আপনি এর প্রতিক্রিয়া করবেন। আপনার কানের শোনার ক্ষমতা বলে দিবে কখন শব্দ আপনার জন্য ক্ষতিকর। এটাই আমাদের মানবদেহের সতর্কীকরণ পদ্ধতি।শব্দ শোনার ক্ষমতাকে প্রতিরক্ষা ও উচ্চ শব্দের উৎস থেকে নিজেকে দূরে রাখতে হবে। কানের প্লাগ ব্যবহার করা যেখানে শব্দের সীমা অনেক বেশি যেমন কোন গানের অনুষ্ঠান, কনসার্ট সেখানে কানের প্লাগ ব্যবহার করা উচিত।

শ্রবণশক্তি হারানোর প্রকারভেদঃ বহিকর্ণ থেকে অন্তকর্ণের শব্দ কমে যায় কনডাকটিভ বধিরতার জন্য সাধারণত মেডিসিন অথবা সার্জারীর চিকিৎসার মাধ্যমে কনডাকটিভ বধির লোকেরা উপকৃত হয়। যদি সার্জারী করা সম্ভব না হয় সেখানে হিয়ারিং এইড (ঐবধৎরহম অরফ ) মাধ্যমে উপকৃত হতে পারে। অন্তকর্ণের সেনসরি কোষ এবং নার্ভ ফাইবার ক্ষতির কারণে সেনসরি নিউরাল শ্রবণশক্তি হারায়। অন্যদিকে মধ্যকর্ণ ইয়ার কেনেল এবং বহিকর্ণের ক্ষতির কারণে কনডাকটিভ শ্রবণশক্তি হারায়। মেডিসিন এবং সার্জারীতে এ ধরনের শ্রবণশক্তি চিকিৎসা করা যায় না। হিয়ারিং এইড এখানে কার্যকরী। উপরের দুই ধরনের শ্রবণশক্তি হারানো মানে মিশ্র শ্রবণশক্তি হারানো।

কি ধরনের হিয়ারিং এইড পাওয়া যায়? কানের পিছনে (বি,টি,ই)ঃ এগুলো ব্যবহারকারীর কানের পিছনে দেয়া হয় এবং ইয়ার ক্ষন্ডের সাথে প্লাষ্ঠিক দ্বারা সংযোগ করা হয়। সম্পূর্ণ শ্রবণশক্তির হারানোর লোকদের জন্য বি,টি,ই ব্যবহার করা হয়।

১)    কর্ণের কেনেলের ভিতরে (আই,টি,ই)ঃ এ ধরনের মডেল গুলো ইয়ার মন্ডের ভিতর ইলেট্রনিকালি তৈরী এ ধরনের এইগুলো একটা নির্দিষ্ট সাইজের দরকার।

২)    সম্পূর্নভাবে কানের ভিতর (সি,আই,সি)ঃ এগুলোর সবচেয়ে ছোট এবং সর্বশেষ হিয়ারিং এইড এটা কানের কেনেলের ভিতর কানের পর্দার কাছে স্থাপন করা হয়। যেসব রোগী হিয়ারিং এইড দেখাতে চান না তখন সি,আই,সি হিয়ারিং এইড কসমেটিক হিসাবেও ব্যবহৃত হয়। সি,আই,সি হিয়ারিং এইডের মূল্য খুব বেশি এবং এটা বাহির থেকে দেখা যায় না। এগুলো সাধারণ থেকে মাঝামাঝি শ্রবণশক্তি হারানোর জন্য ব্যবহার করা হয়।

৩)    বডি ওর্ণ হিয়ারিং এইডঃ এই হিয়ারিং এইড গুলো মাইক্রোফোন এমপ্লিফায়ার একটা কর্ডবিশিষ্ট রিসিভার এবং ইয়ার মোল্ড এই হিয়ারিং এইড গুলো সম্পূর্ণ শ্রবণশক্তি হারানোর জন্য ব্যবহার করা হয় অথবা অন্যান্য হিয়ারিং এইড গুলো যদি কেউ ব্যবহার করতে না পারে তাহলে এই হিয়ারিং এইড ব্যবহার করা হয়।

হিয়ারিং এইড বলতে কি বোঝায়? হিয়ারিং এইড সাধারণত সংজ্ঞা হল এখানে একটা মিনি মাইক্রোফোন সহ একটা লাইড স্পিকার থাকবে এবং একটা রিসিভার থাকবে। এটার কাজ হল আমাদের কানে শব্দ এনটিনসীফাই এবং এম্লিফাই করা। মাইক্রোফোনের কাজ হল শব্দ তরঙ্গকে ইলেট্রনিক সিগনালে পরিনত করা। এম্লি ফিটারের কাজ হল এই ইলেট্রনিক সিগনালকে এম্লি ফাই করা। এই এম্লি ফাই ভলিউম কন্ট্রোল দিয়ে কন্ট্রোল করা যায়। রিসিভার এম্লি ফাইড ইলেট্রনিক সিগনালকে শব্দে রুপান্তরিত করে। ইয়ার মোল্ড কানের ভিতরে থাকে আর এটা এমন ভাবে ব্যবহারকারীর কানে প্রতিস্থাপন করা হয় যাতে শব্দ ঠিকমত কানে পৌঁছে।

কখন হিয়ারিং এইড দরকার? যদি কারও প্রতিদিন সংযোগ রক্ষা করা অথবা কাজে সমস্যা হয় তখন হিয়ারিং এইড দরকার হয়। অনেক সময় ভুক্ত ভুগিরা বুঝতে পারেনা তাহার শ্রবণ এইড দরকার। পরিবারের লোকেরা এবং সহকর্মীরা তার সাথে সংযোগ রক্ষা করতে পারে না। যদি আপনি অথবা আপনার কাছের লোক মনে করে আপনার শ্রবণশক্তি কমে গেছে, তাহলে আপনি একজন নাক, কান, গলা বিশেষজ্ঞ দিয়ে পরীক্ষা করে নিবেন।

কি ধরনের এইড চেনা দরকার? কি ধরনের শ্রবণশক্তি হারিয়েছে তার উপর নির্ভর করে শ্রবণ এইড কিনতে হয়। সবচেয়ে বেশী গুরুত্বপূর্ণ হল কি ধরনের যোগাযোগ রক্ষা করা রোগীর দরকার একজনের একটা অথবা দুটো হিয়ারিং এইড ব্যবহার করা দরকার হতে পারে।

 মস্তিষ্কের সাথে দুই কানেরই যোগাযোগঃ একাডেমিক লিটারেচারের সাপোর্ট করে দুই কানের এম্লিফিকেশন যখন আপনি দুই কানে হিয়ারিং এইড ব্যবহার করবেন।

১)    তখন আপনার কম পাওয়ার লাগবে।

২)    রোগী ভাল বুঝতে পারবেন বিশেষ করে উচ্চ শব্দের সময়।

৩)    হিয়ারিং এইড ব্যবহারকারী ভাল পারসেপশন পাবেন।

৪)    আপনি নিরাপদ থাকবেন কারণ আপনি বুঝতে পারবেন কোথা থেকে শব্দ আসছে।

৫)    আপনি ভাল শব্দের গুনাগুন পাবেন। চুড়ান্ত ভাবে বলতে হয় আপনার কতটা এবং কি টাইপের শ্রবণ ক্ষমতা হারিয়েছে এবং কি ধরণের সংযোগ করা দরকার।

হিয়ারিং এইড কি সাধারণ শ্রবণ শক্তি ফিরিয়ে দেয়? না হিয়ারিং এইড সাধারণ শ্রবণশক্তি ফেরাতে পারে না এবং সব ধরনের শ্রবণ বিশেষ করে শব্দের বেকগ্রাউন্ড এবং দূরের শব্দের ক্ষেত্রে হিয়ারিং এইড হল একটা কমপেনসেশন।

হিয়ারিং এইড লাগানোর পরে ফলো আপ দরকার আছে কিনা অথবা দরকার থাকলে কতদিন পরপর দরকার? হ্যাঁ, ফলো আপের দরকার আছে। কারণ শ্রবণ পরিবর্তন হতে পারে এবং শ্রবণক্ষমতা কম, বেশি হতে পারে এগুলো যত তাড়াতাড়ি সম্ভব করতে হবে যাতে শ্রবণশক্তি হারানো প্রতিরোধ করা যায়। যখন আপনি হিয়ারিং এইড নিবেন আপনাকে একটা পূর্ণমূল্যায়ন করতে হবে নিয়মিত ভাবে। আপনার হিয়ারিং এইড ও পরীক্ষা করতে হবে। আপনার এই চেকআপ প্রতিবছর করতে হবে আপনার শ্রবণ বিশেষজ্ঞ অথবা ডাক্তারের পরামর্শ অনুসারে হিয়ারিং এইড বা কানের শোনার যন্ত্র ব্যবহার করতে হবে।

অধ্যাপক ডাঃ এম আলমগীর চৌধুরী

এমবিবিএস, ডিএলও, এমএস (ইএনটি), এফআইসিএস, গোল্ড মেডালিষ্ট (এবিআই – ইউএসএ)

ভিজিটিং ফেলো (ইউএসএ, কানাডা, সিঙ্গাপুর, হংকং এন্ড ইন্ডিয়া)

নাক, কান, গলা বিশেষজ্ঞ সার্জন

অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ইএনটি

চেম্বারঃ আনোয়ার খান মডার্ণ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, রুম ২০১, এ ব্লক, ২য় তলা, বাড়ী ১৭, রোড ৮, ধানমন্ডি, ঢাকা ১২০৫।

টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Note: All are Not copyrighted , Some post are collected from internet. || বিঃদ্রঃ সকল পোস্ট বিনোদন প্লাসের নিজস্ব লেখা নয়। কিছু ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহীত ।