অধ্যাপক ডাঃ একেএম ফজলুল হক: গ্যাস্ট্রিক বা আলসার নামটির সাথে পরিচিত নন এমন লোক খুঁজে বের করা হয়তো খুব কঠিন হবে। সাধারণত লোকজন গ্যাস্ট্রিক বা আলসার বলতে যা বুঝিয়ে থাকেন আমরা চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলি পেপটিক আলসার। পেপটিক আলসার যে শুধু মাত্র পাকস্থলীতেই হয়ে থাকে তা কিন্তু নয় বরং এটি পৌষ্ঠিক তন্ত্রের যে কোন অংশেই হতে পারে। সাধারণত পৌষ্ঠিক তন্ত্রের যে যে অংশে পেপটিক আলসার দেখা যায় সে গুলো হচ্ছে –

১. অন্ননালীর নিচের প্রান্ত;
২. পাকস্থলী;
৩. ডিওডেনামের বা ক্ষুদ্রান্ত্রের প্রথম অংশ এবং
৪. পৌষ্ঠিক তন্ত্রের অপারেশনের পর যে অংশে জোড়া লাগানো হয় সে অংশে। পশ্চিমা দেশগুলোর তুলনায় উন্নয়নশীল দেশ তথা আমাদের এ উপমহাদেশে এ রোগীর সংখ্যা খুবই বেশী। ধনীদের চেয়ে গরীব লোকদের মধ্যে এ রোগ বেশী দেখা দেয়। তবে নারী পুরুষ প্রায় সমান ভাবে এ রোগে আক্রান্ত হতে পারেন।

যে সব কারনে পেপটিক আলসার হতে পারে – বংশগত , কারো নিকটতম আত্মীয় স্বজন যেমনঃ মা, বাবা, চাচা, মামা, খালা, ফুফু যদি এ রোগে ভুগে থাকেন তবে তাদের পেপটিক আলসার হবার ঝুকি বেশী থাকে। যাদের রক্তের গ্র“প “ও” তাদের মধ্যে এ রোগের প্রবণতা বেশী।

রোগ-জীবানু ঃ হেলিকো বেক্টার পাইলোরি নামক এক প্রকার অণুজীব এ রোগের জন্য বহুলাংশে দায়ী।
ঔষধ ঃ যে সমস্ত ঔষধ সেবনে পেপটিক আলসার হতে পারে তন্মধ্যে ব্যাথা নাশক ঔষধ  বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য।
ধুমপান ঃ ধুমপায়ীদের মধ্যে এ রোগের প্রবণতা বেশী।

এ ছাড়াও কারো পৌষ্ঠিকতন্ত্র থেকে যদি বেশী পরিমানে এসিড এবং প্রোটিন পরিপাককারী এক ধরনের এনজাইম যা পেপসিন নামে পরিচিত তা নিঃসৃত হতে থাকে এবং জন্মগত ভাবেই পৌষ্ঠিকতন্ত্রের গঠনগত কাঠামো দূর্বল থাকে তাহলে ও পেপটিক আলসার হতে পারে।

তবে সাধারণত যে কথাটা প্রচলিত ভাজা-পোড়া কিংবা ঝাল জাতীয় খাবার খেলে পেপটিক আলসার হয় এর কোন সুনির্দিষ্ট প্রমাণ চিকিৎসা বিজ্ঞানে মেলেনি। তবে যারা নিয়মিত আহার গ্রহণ করেন না কিংবা দীর্ঘ সময় উপোস থাকেন তাদের মধ্যে পেপটিক আলসার দেখা দিতে পারে।

উপসর্গ সমূহঃ পেটে ব্যাথা ঃ সাধারণত পেটের উপরি ভাগের মাঝখানে বক্ষ পিঞ্জরের ঠিক নিচে পেটিক আলসারের ব্যাথা অনুভব হয়। তবে কখনো কখনো ব্যাথাটা পেছনের দিকেও যেতে পারে।

ক্ষুধার্ত থাকলে ব্যাথা ঃ এ জাতীয় রোগী ক্ষুধার্ত হলেই প্রচন্ড ব্যথা অনুভব করে এবং খাবার খেলে সাথে সাথে ব্যথা কমে যায়।
ড় রাতে ব্যাথা ঃ অনেক সময় রাতের বেলা পেটে ব্যাথার কারনে রোগী ঘুম থেকে জেগে উঠে কিছু খেলে ব্যাথা কমে যায় এবং রোগী আবার ঘুমিয়ে পরে।
মাঝে মধ্যে ব্যাথা ঃ পেপটিক আলসারের ব্যথা সাধারণত সব সময় থাকেনা, একাধারে ব্যাথাটা কয়েক সপ্তাহ চলতে থাকে তারপর রোগী সম্পূর্ণ রূপে ভাল হয়ে যায়, এ অবস্থা কয়েকমাস থাকে তারপর আবার কয়েক সপ্তাহ ধরে ঠিক আগের মতো ব্যাথা অনুভব হয়।
ব্যথা কমে ঃ পেপটিক আলসার ব্যাথা সাধারণত দুধ, এন্টাসিড, খাবার খেলে কিংবা বমি করলে অথবা ঢেকুর তুললে ব্যাথা কমে। এ ছাড়াও পেপটিক আলসারের রোগীদের মধ্যে বুক জ্বালা, অরুচি, বমি বমি ভাব, ক্ষুধা মন্দা, কিংবা হঠাৎ করে রক্ত বমি অথবা পেটে প্রচন্ড ব্যাথা অনুভব হতে পারে।

চিকিৎসা ঃ শৃংখলা ঃ পেপটিক আলসারে আক্রান্ত রোগীদের অবশ্যই ধুমপান বন্ধ করতে হবে। ব্যাথা নাশক ঔষধ অর্থাৎ এসপ্রিন জাতীয় ঔষধ সেবন থেকে যথা সম্ভব বিরত থাকতে হবে এবং নিয়মিত খাবার গ্রহণ করতে হবে। ঔষধ ঃ পেপটিক আলসারের রোগীরা সাধারণত এন্টাসিড, রেনিটিডিন, ফেমোটিডিন, ওমিপ্রাজল, লেনসো প্রাজল, পেনটো প্রাজল জাতীয় ঔষধ সেবনে উপকৃত হন। কারণ ভিত্তিক চিকিৎসা ঃ জীবানু জনিত কারনে যদি এ রোগ হয়ে থাকে তবে বিভিন্ন ঔষধের সমন্বয়ে চিকিৎসা দেওয়া হয় যা ট্রিপল থেকে থেরাপী নামে পরিচিত।

অপারেশন ঃ পেপটিক আলসারের ক্ষেত্রে অপারেশন সাধারণত জরুরী নয়। তবে দীর্ঘ মেয়াদী ঔষধ সেবনের পরও যদি রোগী ভাল না হন, কিছু খেলে যদি বমি হয়ে যায় অর্থাৎ পৌষ্ঠিক নালীর কোন অংশ যদি সরু হয়ে যায়। সেক্ষেত্রে অপারেশন করিয়ে রোগী উপকৃত হতে পারেন।

সময় মত পেপটিক আলসারের চিকিৎসা না করলে রোগীর নিম্নলিখিত সমস্যাগুলো দেখা দিতে পারে।

যেমন ঃ
১. পাকস্থলী ফুটা হয়ে যেতে পারে;
২. রক্ত বমি হতে পারে;
৩. কালো পায়খানা হতে পারে;
৪. রক্ত শূণ্যতা হতে পারে;
৫. ক্যান্সার হতে পারে (কদাচিৎ) এবং
৬. পৌষ্টিক নালীর পথ সরু হয়ে যেতে পারে এবং রোগীর বার বার বমি হতে পারে।

কাজেই যারা দীর্ঘ মেয়াদী পেপটিক আলসারে ভুগছেন তাদের উচিৎ চিকিৎসকের শরনাপন্ন হওয়া। পেপটিক আলসার জনিত জটিলতা আগে থেকেই সনাক্ত করা এবং সে অনুযায়ী চিকিৎসা নেয়া, প্রয়োজনে অপারেশনের মাধ্যমে চিকিৎসা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা ধরে না রেখে সুস্থ সুন্দর স্বাভাবিক জীবন যাপন করা।

অধ্যাপক ডাঃ একেএম ফজলুল হক
এমবিবিএস, এফসিপিএস, এফআইসিএস
বৃহদন্ত্র ও পায়ুপথ সার্জারী বিশেষজ্ঞ
ফেলো, কলোরেকটাল সার্জারী (সিংগাপুর)
ইন্টারন্যশনাল স্কলার, কলোরেকটাল সার্জারী (যুক্তরাষ্ট্র)
প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান (অবঃ), কলোরেকটাল সার্জারী বিভাগ, বিএসএমএমইউ, ঢাকা।
চেম্বারঃ জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশীপ হাসপাতাল

টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Note: All are Not copyrighted , Some post are collected from internet. || বিঃদ্রঃ সকল পোস্ট বিনোদন প্লাসের নিজস্ব লেখা নয়। কিছু ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহীত ।