ডাঃ নাজমুল কবীর কোরেশীঃ ডায়াবেটিস মেলাইটাস মানেই রক্তে উচ্চমাত্রায় শর্করা যা শরীরে নানারকম সমস্যার জন্ম দিতে পারে। আর এই উচ্চ রক্তশর্করা নিয়ন্ত্রনে আনতে রোগী এবং চিকিৎসকের প্রাণান্ত চেষ্টা। কিন্তু এটাই ডায়াবেটিসে একমাত্র সমস্যা নয়। বরং বিপরীত অবস্থা  আরো ভয়াবহ সমস্যা ডেকে আনতে পারে। যার নাম হাইপোগ্লাইসেমিয়া বা রক্তে শর্করাস্বল্পতা।

যে কোনো কারনে রক্তে শর্করার পরিমান ৭০ মিলিগ্রাম/ডেসিলিটার বা ৩.৯ মিলিমোল থেকে কমে গেলে শরীরে এর ফলে কিছু লক্ষণ দেখা দেয় যা আবার রক্তশর্করার পরিমান বেড়ে গেলেই উপশম হয়ে যায়, একেই হাইপোগ্লাইসেমিয়া বা রক্তে শর্করাস্বল্পতা বলা হয়। এর ফলে রোগীরা বিভিন্ন উপসর্গ এবং জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে পড়েন যা রক্তশর্করার মাত্রা এবং ব্যক্তিভেদে বিভিন্ন তীব্রতার হতে পারে। সাধারণতঃ যারা একবার এই হাইপোগ্লাইসেমিয়ায় আক্রান্ত হন তারা পরবর্তিতে সহজেই তাদের লক্ষণগুলো সনাক্ত করতে পারেন। তবে সত্যিই হাইপোগ্লাইসেমিয়া বা রক্তে শর্করাস্বল্পতা সৃষ্টি হলো কিনা তা নিশ্চিত সনাক্ত করার একমাত্র পদ্ধতি হলো তাৎক্ষনিক আপনার গ্লুকোমিটার মেশিন দিয়ে রক্তশর্করা পরিমাপ করা।

হাইপোগ্লাইসেমিয়া বা রক্তে শর্করাস্বল্পতা কারণসমূহঃ  রক্তশর্করার তুলনায় অতিমাত্রায় বা ভুল  মাত্রায় ইনসুলিন বা ওষুধ গ্রহন, ইনসুলিন বা ওষুধ গ্রহনে ভুল পদ্ধতি,  রক্ত শর্করার তুলনায় ইনসুলিন এবং ওষুধ সমন্যয়হীনতা, ইনসুলিন বা ওষুধ গ্রহনের সাথে খাবার গ্রহনের সময় বা পরিমানে অসামনজস্যতা, ইনসুলিন বা ওষুধ গ্রহনের সাথে জীবনযাপন এবং শারীরিক কাজের অসামনজস্যতা, বিভিন্ন রোগ (হেপাটাইটিস, কিডনীরোগ, যেকোনো গুরুতর অসুস্থতা ইত্যাদি) এবং ওষুধ সেবনের (কুইনিন) সাথে ইনসুলিন বা ওষুধ গ্রহনে সমন্যয়হীনতা, অতিরিক্ত এলকহল পান্ ইত্যাদি।

হাইপোগ্লাইসেমিয়া বা রক্তে শর্করাস্বল্পতা লক্ষণসমূহঃ

প্রত্যেক ডায়াবেটিস রোগী বিশেষকরে যাদের ইদানিৎ ডায়াবেটিস সনাক্ত হয়েছে এবং ওষুধ বা ইনসুলিন ব্যবহার শুরু করেছেন তাদের ডায়াবেটিস শিক্ষার অংশ হিসেবে হাইপোগ্লাইসেমিয়া বা রক্তে শর্করাস্বল্পতা লক্ষণসমূহ জেনে নেয়া অত্যন্ত জরুরী। এ বিষয়ে চিকিৎসকের ভ’মিকাই প্রধান। জেনে নিন প্রধাণ লক্ষণগুলোঃ শরীরে কাপুনি অনুভুত হ্ওয়া, তীব্র ক্ষুধা, বমিভাব, বুক ধরফর, হঠাত ঘাম, হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসা, দুর্বলতা, অতিরিক্ত ক্লান্তি, মাথাব্যাথা, মাথাঘোরানোভাব, ঝিমুনি, চোখে ঝাপসা দেখা, হঠাৎ খিটমিটে মেজাজ, অস্থিরতা, অসংলগ্ন ব্যবহার-আচরণ, ঘুমে দুঃস্বপ্ন দেখা বা ছটছট করা, খিচুনি এমনকি অজ্ঞান হয়ে পড়া।

কি করণীয়ঃ তাৎক্ষনিক ব্যবস্থাঃ যখনই এ লক্ষণগুলোর যেকোনটি অনুভব হবে তৎক্ষনাৎ রক্তশর্করা মেপে ১৫-২০ গ্রাম পরিমান গ্লুকোজ (১ টেবল চামচ) বা সমতূল্য শর্করাযুক্ত খাবার খেয়ে নিন। মনে রাখা জরুরী যে, রক্তশর্করা মাপতে অপারগ হলে এর পিছে সময় ব্যয় না করে রক্তশর্করা না মেপেই দ্রুত চিকিৎসা শুরু করতে হবে। ১৫ মিনিট পর পর রক্তশর্করা মাপতে থাকুন এবং একই চিকিৎসা নিন বারবার নিন যতক্ষণ না রক্তশর্করা ৫.৬ মিলিমোল/ লি বা তার বেশী হচ্ছে। নিরাপদমাত্রায় আসার পর যদি পরবর্তী স্বাভাবিক খাবারের সময় ১ বা দেড় ঘন্টার মধ্যে হয়ে থাকে তবে খাবার নিয়ে নিন। অনথ্যায়, নাস্তা খেয়ে নিন এবং পরবর্তী খাবার স্বাভাবিক সময়ে নিন। ১৫-২০ গ্রাম পরিমান গ্লুকোজ সমতূল্য শর্করাযুক্ত খাবার,  ৩-৪ গ্লুকোজ ট্যাবলেট,  ১/২ কাপ মিষ্টি ফলের রস, ১/২ কাপ শর্করাযুক্ত কোমল পানীয় ,১ কাপ দুধ, ১ টেবলচামচ চিনি বা মধু, ৫-৬ টি ক্যান্ডি।

শর্করাস্বল্পতা লক্ষণসমূহ তীব্রতর হলে, শর্করাস্বল্পতা দ্রুত উন্নতি না হলে বা রোগী ঝিমিয়ে পড়লে বা রোগীকে অজ্ঞান অবস্থায় প্ওায়া গেলে, দ্রুত হসপিটালে নিতে হবে কেননা এ ক্ষেত্রে শিরাপথে উচ্চমাত্রার গ্লুকোজ ব্যবহার করতে হবে। শর্করা স্বল্পতা প্রতিরোধে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।

শর্করাস্বল্পতা বিভিন্ন জটিলতার জন্ম দিতে পারে, যেমনঃ অজ্ঞান হ্য়ে দুর্ঘটনার শিকার হ্ওয়া, মারাত্মক আঘাত প্ওায়া, খিচুনী, স্ট্রোক, চোখে রক্তক্ষরণ, মস্তিস্কের স্থায়ী ক্ষতি, অনিয়ন্ত্রিত হৃদকম্পন, হৃদরোগ এমনকি মৃত্যু।

শর্করাস্বল্পতা প্রতিরোধে জত্নসীল হ্ওয়া খুবই জরুরী। যেমনঃ রোগীর জীবনপদ্ধতি, বিভিন্ন রোগ সম্পকে সঠিক এবং বিস্তারিত ইতিহাস চিকিৎসককে জানিয়ে সঠিক চিকিৎসা গ্রহন করুন। ওষুধ, খাবার এবং জীবনপদ্ধতিতে নিয়মিত এবং নিয়ন্ত্রিত হ্ওয়া। সঠিক মাত্রা, সঠিক সময়, সঠিক পরিমান এবং সঠিক সমন্বয় অত্যন্ত জরুরী। একটি ভালো রক্তশর্করামাপক যন্ত্র আপনার সবচেয়ে জরুরী এবং বিশন্বস্ত বন্ধু। নিয়মিত রক্তশর্করা পরিমাপ করা এবং সে অনুযায়ী ইনসুলিন,ওষুধএবং খাবার এবং শারীরিক পরিশ্রমের সমন্বয় করা সর্বাগ্রে জরুরী। প্রয়োজনে চিকিৎসককে অবহিত করুন।ডায়ারিয়া বা অন্য কোনো কারনে খাবার গ্রহনে সমস্যা হলে রক্তশর্করা পরিমাপ করে তা কম প্ওায়া গেলে  (যেমন ৫.৫ – ৬ মিলিমোল বা কম) ইনসুলিন,ওষুধ এর মাত্রা কমিয়ে (যেমন, ৫০% মাত্রা কমিয়ে) নিন। রোজা বা উপবাস থাকলে ইনসুলিন বা ওষুধ এর মাত্রা কমিয়ে (যেমন, ৫০% মাত্রা কমিয়ে) নিন। এলকহল পান পরিহার বা পরিমিত করুন। এক বারে বেশী খাবার না খেয়ে, খাবার গ্রহনের সময় ব্যবধান কমিয়ে আনুন (যেমন, ৩ ঘন্টা পর পর)। রাতে শোয়ার আগে রক্তশর্করা পরিমাপ বয়সভেদে ৬ বা ৭ মিলিমোল এর কম হলে হালকা নাস্তা বা ফল/দুধ খেয়ে নিন। দীর্ঘ ভ্রমনে নিয়মিত রক্তশর্করা পরিমাপ করুন এবং প্রয়োজনে রক্তশর্করা কম হলে ঘন ঘন খাবার গ্রহন করুন। কোন দিন শারীরিক প্ররিশ্রম বেশী হবে এমনটি আগে থেকে জানলে ্ওষূধ বা ইনসুলিনের পরিমান আগেই কমিয়ে নিন। ব্যায়াম, শারীরিক ভারী পরিশ্রমের আগে রক্তশর্করা পরিমাপ করে নিন এবং প্রয়োজনে (যেমন রক্তশর্করা ৫.৫ – ৬ মিলিমোল বা কম হলে) খাবার খেয়ে নিন এবং ঘন ঘন রক্তশর্করা মেপে নিন।

যারা দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবেটিসে ভুগছেন, ঘন ঘন শর্করাস্বল্পতায় আক্রান্ত হয়েছেন, স্ট্রোক, মস্তিস্করোগ, লিভার বা কিডনীরোগ বা নানা রোগ জটিলতায় আক্রান্ত, অতিবয়স্ক, তাদের ক্ষেত্রে রক্তশর্করার লক্ষ্যমাত্রা (যেমনঃ ৮-১২ মিলিমোল/লি) কমবয়সী ডায়াবেটিক রোগীর তুলনায় একটু বেশী রাখা ভালো।

রক্তস্বল্পতার প্রাথমিক প্রতিরোধে এবং চিকিৎসায় যা করণীয় তা প্রতিটি ডায়াবেটিস রোগী এবং তার বাসার নিকটজনদের জেনে রাখা অত্যন্ত জরুরী। প্রয়োজনে অন্যান্য ডায়াবেটিস রোগীদের সাথে এবং বাসায় নিকটজনদের সাথে নিয়মিত মতবিনিময় করুন। ঘরে প্রয়োজনীয় শর্করা বা শর্করাযুক্ত খাবার মজুত রাখুন। রক্তশর্করামাপক যন্ত্র এবং তার অন্যান্য সরনজাম ঠিক আছে কিনা তা নিয়মিত লক্ষ্য রাখুন এবং পরিবারের সবাই এ ব্যাপারে প্রশিক্ষিত হয় জরুরী।

ডাঃ নাজমুল কবীর কোরেশী

মেডিসিন ও ডায়াবেটিস রোগবিশেষজ্ঞ

মেডিসিন বিভাগ

ইউনাইটেড হাসপাতাল লিমিটেড।

টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Note: All are Not copyrighted , Some post are collected from internet. || বিঃদ্রঃ সকল পোস্ট বিনোদন প্লাসের নিজস্ব লেখা নয়। কিছু ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহীত ।