ডা. রেজাউল করিম কাজল: প্রত্যক বাবা মা-ই চায় তাদের সন্তান সুস্থ্য সুন্দর ভাবে জন্ম লাভ করুক। কিন্তু কারো কারো এ স্বপ্ন ভেঙ্গে যায় জানা অজানা নানা কারনে। পরিসংখ্যান মতে প্রতি ৩০ টি বাচ্চার মধ্যে একটি বাচ্চা কোন না কোন জন্মগত ত্র“টি নিয়ে পৃথিবীতে আসে। কোন বাচ্চা শারীরিক বা গঠনগত ত্র“টি নিয়ে জন্মায় আবার কোন বাচ্চা জেনেটিক বা ডিএনএ জনিত ত্র“টি নিয়ে জন্মায়। শারীরিক বা গঠনগত ত্র“টির কোন কোন ক্ষেত্রে চিকিৎসা থাকলেও বেশীরভাগ জেনেটিক ত্র“টির চিকিৎসা নেই বা থাকলেও অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং অসম্পূর্ন। দেশ ও জাতিভেদে জন্মগত ত্র“টির ধরন ও কারন ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে। অনেক সময় বাবা-মা জেনেটিক রোগের বাহক হলে তাদের সন্তান উক্ত জেনেটিক রোগ নিয়ে জন্মায়। আমাদের দেশে থ্যালাসেমিয়া একটি মারাতœক জেনেটিক/জন্মগত রক্তরোগ। বাবা-মা এ রোগের বাহক হলে তাদের সন্তান থ্যালাসেমিয়া রোগ নিয়ে জন্মাতে পারে। যারা থ্যালাসিমিয়া রোগের বাহক তাদের কোন উপসর্গ নেই। এরা স্বাভাবিক জীবনযাপন করে। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় দশভাগ অর্থাৎ প্রায় দেড় কোটি পুরুষ-মহিলা নিজের অজান্তে থ্যালাসেমিয়া রোগের বাহক। আমাদের দেশে প্রতিবছর হাজার হাজার শিশু থ্যালাসেমিয়া রোগ নিয়ে জন্মায়। কিন্তু জন্মের পর পরই এ রোগটি ধরা পড়েনা। শিশুর বয়স এক বছরের বেশী হলে বাবা মা লক্ষ্য করেন শিশুটি ফ্যাকাসে হয়ে যাচ্ছে, বাড়ছে শিশুর দূর্বলতা। আর তখনই শিশু বিশেষজ্ঞ রক্ত পরীক্ষা করে শিশুটিকে থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত শিশু হিসাবে চিহ্নিত করেন, বাবা-মায়ের মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ে। বাবা-মা জানতে পারেন যে তারা দুজনেই থ্যালসেমিয়া রোগের বাহক।

থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত শিশুর কি সমস্যা হয়?

থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের শরীরে রক্তের মূল্যবান উপাদান হিমোগ্লোবিন ঠিকমতো তৈরী হয়না। শিশুর বয়স এক বা দুই বছর হলে শিশুর রক্ত শূন্যতা দেখা দেয় এবং ফ্যাকাশে হয়ে পড়ে। শিশুর স্বাভাবিক দৈহিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়, শরীর দূর্বল হয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে শরীরের দরকারী অঙ্গ যেমন প্লীহা, যকৃৎ বড় হয়ে যায় এবং কার্যক্ষমতা হারাতে থাকে। মুখমন্ডলের হাড়ের অস্থিমজ্জা বিকৃত হওয়ার কারনে শিশুর চেহারা বিশেষ রুপ ধারন করে যা দেখে চিকিৎসক সহজেই থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত শিশুকে চিহ্নিত করতে পারেন। থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত শিশুদেরকে অন্যের রক্ত নিয়ে বেঁচে থাকতে হয়। অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন থ্যালাসেমিয়া রোগের একমাত্র চিকিৎসা যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও সব সময় সফল নয়।

প্রতিরোধের উপায়ঃ

সরকারী বেসরকারী পর্যায়ে এ রোগ নিয়ে সচেতনতা তৈরীর তেমন উদ্যোগ নেই। একটু সচেতন হলেই আমরা এ রোগ প্রতিরোধ করতে পারি। পৃথিবীর অনেক দেশে বিয়ের আগে পাত্র-পাত্রীর বা বাচ্চা নেয়ার আগে স্বামী-স্ত্রীর থ্যালাসেমিয়া আছে কি না তা পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করে থ্যালাসেমিয়া রোগকে নিয়ন্ত্রন করা গেছে। যে কেউ থ্যালাসিমিয়া রোগের বাহক হতে পারে। রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে সহজেই জানা যায় কেউ থ্যালাসেমিয়া বাহক কিনা। বাবা এবং মা দুজনেই থ্যালাসেমিয়া রোগের বাহক হলেই কেবল সন্তানের থ্যালাসেমিয়া রোগ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। একজন বাহক এবং অপরজন সুস্থ এমন দুজনের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক হলে সন্তানদের কোন সমস্যা হবেনা।

 যদি স্বামী-স্ত্রী দুজনেই থ্যালাসেমিয়া রোগের বাহক হয় তাহলে সুস্থ্য বাচ্চা পাওয়ার উপায় কি?

স্বামী এবং স্ত্রী দুজনই যদি থ্যালাসেমিয়া রোগের বাহক হন তবে সন্তান গ্রহনের ক্ষেত্রে মাতৃজঠরে বাচ্চার ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে বাচ্চার থ্যালাসেমিয়া রোগ নির্নয় তাদের একমাত্র ভরসা। মায়ের গর্ভে বাচ্চার বয়স যখন ১২ হতে ১৫ সপ্তাহ তখন প্রাথমিক গর্ভফুল হতে কোষকলা সংগ্রহ বা গর্ভের বাচ্চার চারপাশের পানি সংগহের  মাধ্যমে বাচ্চার ডিএনএ সংগ্রহ করা হয়। আর এই ডিএনএ নমুনা পরীক্ষা করে গর্ভের বাচ্চার থ্যালাসেমিয়া রোগ আছে কিনা তা শতভাগ নিশ্চিত হওয়া যায় । এ সময় বাচ্চার আকার থাকে দেড় হতে দুই ইঞ্চির মতো। কাজেই সুস্থ বাচ্চা পাওয়া না পাওয়া সম্পর্কে নিশ্চিৎ হয়ে বাবা-মা গর্ভাবস্থা চালিয়ে যাওয়ার ব্যপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এভাবে থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত সন্তানের জন্ম প্রতিরোধ করা সম্ভব।

 রক্ত সঞ্চালনের মাধ্যমে থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত শিশুদেরকে বাঁচিয়ে রাখতে বিশাল রক্তের ভান্ডার প্রয়োজন হচ্ছে। আনুসাঙ্গিক খরচ বহন করতে গিয়ে আর্থিক দৈন্যতা ও মানসিক যন্ত্রনায় ভুগছে লাখো বাবা-মা। শুধু তাই নয়, বাবা মায়ের সামনেই ১০ থেকে ১৫ বছর বয়সের মধ্যে বেশীরভাগ থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত শিশুর জীবন প্রদীপ নিভে যাচ্ছে। আমাদের দেশে থ্যালাসেমিয়া এখন এক নিরব মহামারী যাতে প্রতিবছর হাজার হাজার শিশুর মৃত্য হচ্ছে। ধংস হচ্ছে বাবা-মায়ের স্বপ্ন। দৈনন্দিন জীবনে আমরা ভালো থাকার জন্য কত না পরিকল্পনা করি। আসুন সুস্থ্য সন্তানের বাবা মা হওয়ার জন্য, মেধাদীপ্ত দেশ গড়ার জন্য, থ্যালাসেমিয়া রোগ সম্পর্কে সচেতন হই।

ডা. রেজাউল করিম কাজল

সহযোগী অধ্যাপক

প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগ

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়

 

টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Note: All are Not copyrighted , Some post are collected from internet. || বিঃদ্রঃ সকল পোস্ট বিনোদন প্লাসের নিজস্ব লেখা নয়। কিছু ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহীত ।