ফিরোজা খাতুনঃ খাদ্য গ্রহণের প্রধান উদ্দেশ্য হলো সুস্থ, সবল ও কর্মক্ষম হয়ে বেঁচে থাকা। শিশুদেরকে যেকোন খাবার দিয়ে পেট ভরানো যায় সত্য কিন্তু  তাতে তাদের দেহের পুষ্টির চাহিদা সম্পূর্ণভাবে পূরণ হয় না, যার ফলে শিশু সুস’ভাবে বেড়ে উঠতে পারে না। খাদ্যকে মূলত তাপ ও শক্তিদায়ক, শরীর বৃদ্ধি ও ক্ষয়পূরক এবং রোগ প্রতিরোধক এই তিনভাগে ভাগ করা হয়। ফলকে রোগ প্রতিরোধক খাদ্য বলা হয়। ফল আমাদের শরীরে রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ শক্তি গড়ে তোলে। ফলের মধ্যে রয়েছে দেহের প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদন। বিশেষত বিভিন্ন প্রকার ভিটামিন ও খনিজ পদার্থের সবচেয়ে সহজ ও সস্তা উৎস হলো ফল। ফল রান্না ছাড়া সরাসরি খাওয়া যায় বিধায় শিশুরা সহজেই খেতে পারে। আবার এসব পুষ্টি উপাদান অবিকৃত অবস্থায় দেহ কর্তৃক গৃহীত হয় যা শিশুদেরকে বিভিন্ন রোগের হাত থেকে রক্ষা করে স্বাভাবিক জীবনযাপনে সহযোগিতা করে।

পুষ্টিবিদগণের মতে, একজন বাড়ন্ত শিশুর দৈনিক ২০০-২৫০ গ্রাম ফল খাওয়া উচিত। কিন’ বর্তমানে আমরা গড়ে প্রতিদিন মাত্র ৩৫-৪০ গ্রাম ফল খেয়ে থাকি। অর্থাৎ শিশুরা তাদের চাহিদার তুলনায় অনেক কম পরিমাণ ফল গ্রহণ করছে। ফলে শিশুরা বিভিন্ন পুষ্টি উপাদানের অভাবজনিত রোগ যেমন- রাতকানা, রক্তস্বল্পতা, বেরিবেরি, স্কার্ভি, গলগণ্ড, অন্ধত্বে ভুগছে। ফল দেহের জন্য অপরিহার্য এবং এতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন, খনিজলবণ ও আঁশ থাকে। এসব পুষ্টি উপাদান রোগ প্রতিরোধ ছাড়াও খাদ্যদ্রব্য হজম খাবারে রুচি বৃদ্ধি, বদহজম ও কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। এ দেশের লাখ লক্ষ শিশুর পুষ্টিহীনতার কারণে নানা ধরনের রোগের শিকার হয়ে প্রতিনিয়ত মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এ দেশের খাদ্য চাহিদা পূরণের জন্য দানা জাতীয় খাদ্যে যেমন- ধান, গম, ভুট্টা উৎপাদনের প্রতি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে- অথচ ফলমূল জাতীয় খাবারে যে অনেক ঘাটতি রয়েছে এবং এসব অতি প্রয়োজনীয় খাবারের অভাবে যে কেবলমাত্র দানা জাতীয় খাদ্য দ্বারা পূরণ করা যায় তা আমরা বিবেচনা করি না। এ জন্য শিশুদের স্বাস’্য গঠনে পুষ্টিকর ফলমূল খাওয়ানোর অভ্যাস গড়ে তুলতে মায়েদের অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। একজন শিক্ষিত ও সচেতন মাকে তার শিশুর পুষ্টিগুণ বিচার করে, কোন ফলে কি পরিমাণ পুষ্টি রয়েছে এবং তা খাওয়ালে শিশুর মধ্যে কোন কোন রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে উঠবে সে বিষয়ে জ্ঞান থাকতে হবে।

শিশুদের স্বাস্থ্য রক্ষায় ভিটামিন ‘সি’ সমৃদ্ধ ফল আমলকী, পেয়ারা, কুল, লেবু, জামরুল, কামরাঙা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এর অভাবে স্কার্ভি নামক চর্মরোগ হয়, দাঁতের মাড়ি থেকে রক্ত পড়ে এবং কাটা ঘা সহজে শুকায় না। উপরন’ ভিটামিন ‘সি’ মানবদেহে লৌহ নামক খনিজ পদার্থের শোষণে সহায়তা করে। লৌহ মানবদেহে রক্ত তৈরির প্রধান উপাদান। ভিটামিন ‘সি’-এর অভাব হলে লৌহ শোষণে বিঘ্ন ঘটে। ভিটামিন ‘সি’ শিশুদের ঠাণ্ডাজনিত রোগের হাত থেকে রক্ষা করে। শিশুরা খুব চঞ্চল ও অসি’র হয়। যার ফলে তারা সারাক্ষণ খেলাধুলা ও বিভিন্ন প্রকার দুষ্টমি করতে পছন্দ করে। এতে শরীরের বিভিন্ন স্থানে ক্ষত সৃষ্টি হয়। শরীরের ক্ষত পূরণে এবং কোষ কলার কার্যকারিতা বৃদ্ধি করতে ভিটামিন ‘সি’ খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আমাদের দেশের প্রায় ৯০% লোক ভিটামিন ‘সি’-এর অভাবে এবং ৭০% লোক রক্তশূন্যতায় ভুগছে। তাই এই বিপুল জনগোষ্ঠীর পুষ্টিহীনতা দূরীকরণে ভিটামিন ‘সি’-এর গুরুত্ব অপরিসীম। পৃথিবীর উন্নত দেশসমূহে লেবুজাতীয় ফল থেকে ভিটামিন ‘সি’-এর ২০-৪০% চাহিদা পূরণ হয়ে থাকে। আমরা যদি, আমাদের দেশীয় ফল আমলকী, পেয়ারা, আনারস, লেবু জাতীয় ফল সংরক্ষণ ও গুদামজাত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারি তাহলে সারা বছর এ ফলগুলো খাওয়া যাবে যা ভিটামিন ‘সি’-এর ঘাটতি পূরণে সহায়ক হবে।

ভিটামিন ‘এ’-এর অভাবে শিশুর চোখের চকচকে ভাব নষ্ট হয়ে বিবর্ণ হয়। আস্তে আস্তে কর্নিয়ার চারপাশে কুঁচকে হয়ে যায় এবং চোখের ওপর দাগ পড়ে। শিশুর শরীরে ভিটামিন ‘এ’র অভাব হলে আবরণ কলার কোষগুলো নষ্ট হয়ে যায়। শরীরের দেহচর্ম খসখসে, শুষ্ক ও আঁশসুলভ হয়ে পড়ে। ভিটামিন ‘এ’-এর অভাবে স্নায়ুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে এবং ল্যাথারিজম নামক রোগে নিম্নমানের পক্ষাঘাত হয়ে থাকে। কাঁঠাল, আম, পেঁপেতে প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন ‘এ’ আছে।

ভিটামিন ‘বি’-এর অভাবে মানব শিশুর স্নায়ু নিয়ন্ত্রক বস’র উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটিয়ে স্নায়ুর অস্বাভাবিক উদ্দীপনা, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের আক্ষেপ, স্নায়ুতন্ত্রে ক্ষত দেখা দিতে পারে। এর অভাবে ঠোটের উভয়পাশে ক্ষতের সৃষ্টি হয় এবং ঠোঁটের ফাটল ও প্রদাহ দেখা দেয়। শিশুদের চর্ম শুষ্ক ও খসখসে হয়ে যায়, চুল উঠে যায় এবং চর্মে জ্বালার সৃষ্টি হয়। এর অভাবে চক্ষুতে আলো পড়ার সাথে সাথে চোখ কর কর করে। দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে, পানি পড়ে, চুলকায়, এমনকি চোখে ছানি পড়তে পারে। ভিটামিন ‘বি’-এর অভাবে শিশুরা শারীরিক ও মানসিক অবসাদ, আবেগপ্রবণ, খিটখিটে মেজাজের হয়। পেয়ারা, আম, কাঁঠাল আনারস ও নারকেল প্রভৃতি ফল ভিটামিন ‘বি’-এ ভরপুর।

ক্যালসিয়ামের অভাবে শিশু অত্যন্ত দুর্বল ও জীর্ণ-শীর্ণ হয়ে যায়। হাড়ের পুষ্টি বন্ধ হয়ে যায় এমনকি হাত ও পায়ের হাড় বাঁকা হয়ে যায়। মেরুদণ্ড বক্র হয় এবং মেরুদণ্ডের দুর্বলতার জন্য হাঁটতে পারে না। শিশুদের দাঁত বিলম্বে ওঠে। সমস্ত শরীর শীর্ণ এবং পেট ও মাথা বড় হয়ে যায়। ক্যালসিয়াম রক্ত জমাট বাঁধার কাজে সাহায্য করে। কামরাঙা, বাতাবিলেবু, ডালিম, বেল, খেজুর, আমলকী, কলা প্রভৃতি ফলে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম থাকে। মেধা ও শক্তিসম্পন্ন জাতিতে পরিণত হতে হলে আমাদের শিশুদেরকে বিভিন্ন প্রকার পুষ্টিকর মৌসুমি ফল খাওয়ানোর অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে এবং বেশি করে বিভিন্ন ধরনের ফলের চারা রোপণ করতে হবে।

ফিরোজা খাতুন, ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্র, যশোর

টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Note: All are Not copyrighted , Some post are collected from internet. || বিঃদ্রঃ সকল পোস্ট বিনোদন প্লাসের নিজস্ব লেখা নয়। কিছু ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহীত ।