ডা. আহমেদ হেলালঃ  মানসিক সমস্যা ও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে বিভ্রান্তি আর নেতিবাচকতার শেষ নেই। রয়েছে নানা  সংস্কার ।  মানসিক স্বাস্থ্য  বিষয়ে এই সংস্কারাচ্ছন্ন মনোবৃত্তির কারণ এই নয় যে  এবিষয়ে প্রচারণা কম বরং  প্রচারণা অনেক বেশি এবং সেটি হচ্ছে অপপ্রচার।  ‘মানসিক রোগ’ ‘মানসিক সমস্যা’ ‘মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ’ ‘মানসিক রোগের চিকিৎসা’  ইত্যাদি বিষয়ে  প্রকৃত জ্ঞানের অভাবের কারণে  বিষয়গুলো নিয়ে তৈরি হয়েছে ধূম্রজাল। অনেক সময় কোনো কোন চিকিৎসকও প্রকৃত তথ্য না জেনে মানসিক রোগকে (নিউরোলজিক্যাল) রোগ বলে প্রচার করার চেষ্টা করেন। মানসিক সমস্যা বলতে সাধারণ বাংলায় প্রায় সকলেই বুঝে থাকেন ’পাগলামী’ , মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ মানেই ’পাগলের ডাক্তার’ আর সর্বাধিক লোকপ্রিয় ট্যাবু হচ্ছে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞরা সকলেই কম বেশি ’পাগল’। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে অশিক্ষিত-অক্ষরজ্ঞানহীন  খালিপায়ে হাঁটা মানুষদের চাইতে ডিগ্রিধারী  শহুরে মানুষদের মধ্যে এই ধারণার প্রাদুর্ভাব বেশি। কোনো মেডিসিন বা হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ যদি  কোনো রোগীকে পরামর্শ দিয়ে ফেলেন যে ‘আপনি  একজন সাইকিয়াট্রিস্ট (মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ) দেখান’ অমনি রোগীর মুখ অন্ধকার! তাকে যদি ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ এর কাছে যেতে বলা হতো তাওতো সমাজে মাথা উঁচু করে গর্ব করে বলা যেত ‘আমার ক্যান্সার , কিন্তু মানসিক রোগ …. ছিঃ ছিঃ !!— আমি কি পাগল?”

ছোট বড় যেকোনো মানসিক সমস্যায় যে কেউ যখন তখন আক্রান্ত হতে পারেন,  মনে রাখতে হবে মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত কাউকে ‘পাগল’ বলে আখ্যায়িত করা যাবেনা।  পাগল শব্দটি তুচ্ছার্থে বা হীণার্থে ব্যবহৃত হয়, চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় বা সভ্য কথ্যরীতিতে মানসিক রোগীকে পাগল বলা অনৈতিক ও অশালীণ। মানসিক স্বাস্থ্যসেবা মানে কিন্তু কেবল মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যেয়ে ওষুধ সেবন অথবা শুধু কাউন্সিলিং-সাইকোথেরাপি নয়, এর ব্যপ্তি অনেক বিশাল। আপনি ভালো একটি সুরেলা সঙ্গীত শুনবেন সেটিও মানসিক স্বাাস্থ্যসেবা, আপনি সপরিবারে বেড়াতে যাবেন সেটিও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, অফিসে কাজের ফাঁকে আড্ডা দিন- কৌতুক করুন, ভালো বই পড়–ন সেটিও আপনার কর্মক্ষমতাকে বাড়িয়ে মনের স্বাস্থ্যকে সুদৃঢ় রাখবে। তাই মানসিকভাবে যারা বিপর্যস্ত তাদের আরোগ্যের পাশাপাশি যারা নিরোগ মন নিয়ে কাটিয়ে দিতে চান ক্লেশহীন জীবন তাদের সকলের জীবনেই  মানসিক স্বাস্থ্যসেবার উপযোগিতা  রয়েছে। যে শিশুটি সদ্য স্কুলে যেতে শিখেছে তার বিকাশের জন্য যা যা প্রয়োজন তা যোগাবে এই মানসিক স্বাস্থ্যসেবা। বয়োসন্ধিকালে সে বিগড়ে যাচ্ছে কিনা- তার আচরণগুলো সমাজবিরোধী হয়ে উঠছে কিনা, নেশার ফাঁদে পড়ে যাচ্ছে কিনা অথবা প্রেমের ঢেউয়ে তার মন আন্দোলিত হচ্ছে কিনা সেগুলো দেখভাল করার দায়িত্ব কিন্তু এই মানসিক স্বাস্থ্যসেবার। আবার সংসারজীবনে জীবনসঙ্গী বা সঙ্গীনির সাথে  ভারসাম্যপূর্ণ জীবন কাটাতে হলেও প্রয়োজন মানসিক স্বাস্থ্যসেবার। এমনকি অবসরজীবনে বা বার্ধক্যে যখন কর্মহীনতা আর একাকীত্ব মানুষকে গ্রাস করে তখন বিষন্নতা থেকে মুক্ত থাকতে  ধূসর হয়ে যাওয়া হৃদয়টিকেও দিতে হয় কিছু মানসিক স্বাস্থ্যসেবা।  এর বাইরে যারা সুনির্দিষ্ট  মানসিক সমস্যায় ভূগছেন তাদের সে সমস্যা নিরাময় বা নিয়ন্ত্রণে চিকিৎসাবিজ্ঞানের অন্যতম শাখা মনোরোগবিদ্যার প্রায়োগিক রূপ মানসিক স্বাস্থ্যসেবা। তাই রোগাক্রান্তদের পাশাপাশি  যারা আপাত সুস্থ্য রয়েছেন তাদের সকলের ধারাবাহিক সুস্থ্যতার জন্য চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই শাখাটি অবশ্যই প্রয়োগযোগ্য।

 যাদের জন্য এই সেবা কেবল তারা গ্রহণ করলে বা তাদের সচেতনায়  বিজ্ঞানের এই শাখাটি কিন্তু সার্থক হয়ে উঠবে না বরং যারা এই সেবাটি প্রয়োগ করবেন তাদের উপরেও দায়িত্ব বর্তায়। কিন্তু এখানেও দেখা যায় আরেক ধরণের টানাপোড়েন। আদর্শ মানসিক স্বাস্থ্যব্যবস্থায় সেবা দেবেন সকলেই। কিন্তু সমস্যা বাধে যখন এই সেবা প্রদানের প্রক্রিয়াতে প্রত্যেকেই যার যার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চান। কেউ হয়তো বলেন যে ‘মুখের মিষ্টি কথায় আর গালভরা উপদেশে  মানসিক সমস্যা কি ভালো হয় ? ওষুধ খেতেই হবে’ আবার কেউ বলেন ‘ওষুধ খেয়ে অনেক সাইড এফেক্ট হবে! কেবল পরামর্শ আর আচরণ পরিবর্তন মূলক থেরাপিই পারবে আপনাকে মানসিক ভাবে সুস্থ্য রাখতে’ কেউ বলেন ‘ডাক্তার-সাইকোলজিস্ট কিছুই না- বিয়ে দিলেই সুস্থ হয়ে যাবে’ ।  এ্র সবগুলোই ভুল ধারণা , বিশেষত মানসিক রোগ আক্রান্তকে বিয়ে দেয়া হলে  অনেক সময় রোগ লক্ষণ বহুগুণে বেড়ে যায় বা তৈরি হয় নতুন জটিলতা।

 আদর্শ মানসিক স্বাস্থ্যসেবার মূল নীতি হচ্ছে বায়ো-সাইকো-স্যোশ্যাল   বা মনো-দৈহিক-সামাজিক  নিদান। এই নীতিতে ওষুধ, সাইকোথেরাপি ও সামাজিক সহায়তা  সব কিছুরই সমান গুরুত্ব রয়েছে।   মানসিক রোগের ওষুধ সম্পর্কে কারণে বা অকারণে ছড়ানো হয় অহেতুক ভীতি ও অপপ্রচার। গুরুতর মানসিক রোগে ওষুধ যখন প্রধান চিকিৎসাপদ্ধতি তখন ওষুধবিরোধীতা করে প্রকারান্তরে রোগীকে প্রতারণাই করা হয়। মানসিক রোগের ওষুধের এক কিয়দংশ মাত্র মানুষকে ঘুমাতে সাহায্য করে- অথচ মানসিক রোগের ওষুধ মাত্রই ঘুমের ওষুধ হিসেবে অপপরিচিতি লাভ করেছে। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার বিষয়েও  রয়েছে অপপ্রচার- অন্যান্য রোগের ওষুধের মধ্যে যেরকম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকে মানসিক রোগের ওষুধেও সেরকম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকে, অতিরিক্ত কিছু নয় ।  কিন্তু সাধারণ মানুষের মধ্যে থাকা ওষুধভীতিকে পুজিঁ করে ওষুধ বিরোধীরা অপপ্রচারের ডংকা বাজিয়েই যাচ্ছেন।  অপরদিকে  কেবল ওষুধনির্ভর উন্নাসিক গোষ্ঠি ক্রমাগত তাচ্ছিল্য করে যাচ্ছেন মনো-সামাজিক নিদান পদ্ধতিকে, যেখানে কাউন্সিলিং, সাইকোথেরাপি ও আচরণভিত্তিক বিজ্ঞানসমর্থিত গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়াগুলো রয়েছে।  মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় যারা নিয়োজিত রয়েছেন তাদের  প্রত্যেককে অবশ্যই হতে হবে  পেশাদার। কিন্তু কেবলমাত্র নিজের পেশার আধিপত্য স্থাপনের চেষ্টায়  যদি তারা মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েন, নিজের কর্মপরিধির সীমানা পার হয়ে আত্মপ্রচারের অসীম লক্ষ্যের দিকেই  ছুটে চলেন তবে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পরিণত হবে মানসিক স্বাস্থ্যব্যাবসায়। এমনিতেই সাধারণ মানুষের মধ্যে মানসিক সমস্যা ও তার চিকিৎসাপদ্ধতি নিয়ে রয়েছে নানা সংস্কার ও দ্বিধা, তার উপর যদি মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় কর্মরত পেশাজীবিরা নিজেরাই আরো ধোঁয়াশার সৃষ্টি করেন তবে বিষয়টি পশ্চাদমুখি হয়ে পড়বে।

শত টানাপোড়েন আর সীমিত সম্পদ নিয়ে একটু একটু করে এগুচ্ছে বাংলাদেশের মানসিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা, এটিকে ক্রমাগত অগ্রসর রাখতে হলে  সকলের সম্মিলিত প্রয়াস ও পেশাগত উৎকর্ষতা আরো বৃদ্ধির প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে যে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সকলের জন্য এবং এই সেবার চাকাটিকে সচল রাখতে হলে সাইকিয়াট্রিস্ট-সাইকোলজিস্ট-কাউন্সিলর-সাইকিয়াট্রিক স্যোশাল ওয়ার্কার-অকুপেশনাল থেরাপিস্ট-স্পীচ থেরাপিস্ট-ফিজিয়োথেরাপিস্ট-সাইকিয়াট্রিক নার্স- রোগীর স্বজন-প্রতিবেশী-স্কুলশিক্ষক ইত্যাদি নানা পেশার মানুষকে একসাথে কাজ করে যেতে হবে।   মুক্ত থাকতে হবে সকল অপপ্রচার ও বিভ্রান্তি থেকে।

ডা. আহমেদ হেলাল, সহকারী অধ্যাপক

চাইল্ড  এডোলেসেন্ট  এন্ড ফ্যামিলি সাইকিয়াট্রি

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, ঢাকা

রিপোর্টঃ সীমা আক্তার মেঘলা

টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Note: All are Not copyrighted , Some post are collected from internet. || বিঃদ্রঃ সকল পোস্ট বিনোদন প্লাসের নিজস্ব লেখা নয়। কিছু ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহীত ।