ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদঃ  আট বছরের ছেলে সুমিত। স্বচ্ছ।  পড়ে একটি নামী স্কুলে। ইদানিং প্রায় প্রতিদিন সকালে সে ঘুম থেকে উঠে কান্নাকাটি করে।  প্রায় প্রতিদিনই তার পেট ব্যথা হয়, বমি করার চেষ্টা করে- স্কুলে যেতে চায় না। স্কুলে যাবার সময় পার হলেই সে মোটামুটি সুস্থ্য হয়ে উঠে। প্রায়ই স্কুলে যেতে পারে না সে। মা-বাবা ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলেন, ডাক্তার পেট টিপে টুপে- রক্ত সহ নানাবিধ পরীক্ষার রিপোর্ট হতে নিয়ে মন্তব্য করেন , ভয়ের কিছু নেই, সুমিতের এই সমস্যার নাম স্কুল ভীতি।’তিনি একজন  মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠালেন তাদের। অল্প দিনের মধ্যেই স্বচ্ছস্বাভাবিকভাবে স্কুল করা শুরু করলো। এধরণের  সমস্যা  অনেক বাচ্চাদেরই হয়ে থাকে।  সাত বছর বয়স থেকে শুরু করে ষোলো বছর বয়স এর মধ্যে স্কুলভীতি হতে পারে। তবে সাধারণত সাড়ে সাত বছর থেকে সাড়ে দশ বছর বয়সের মধ্যে এ সমস্যা বেশি দেখা দেয়। বিশ্বে স্কুলগামী শিশুদের মধ্যে শতকরা ২.৪ জন শিশুর মধ্যে এ সমস্যা রয়েছে।  প্রথম স্কুলে ভর্তির এক দু বছরের মধ্যে অথবা পরবর্তীতে কোনো কারণে স্কুল পরিবর্তন করা হলে এ সমস্যা দেখা দিতে পারে।

কেন স্কুলভীতি হয়?

প্রথম স্কুলে  যাওয়া শুরু করলে, স্কুলের বন্ধুরা কোনো কারণে উত্যক্ত করলে, নতুন স্কুলে ভর্তি হলে-  নতুন পরিবেশে নতুন বন্ধুদের সাথে মিশতে না পারলে, নতুন শিক্ষা পদ্ধতিতে পরিবর্তিত হলে – যেমন এক মাধ্যম থেকে আরেক মাধ্যমে ভর্তি হলে, দীর্ঘদিন কোনো কারনে  স্কুলে না গেলে , কোনো কারণে তীব্র শক পেলে- যেমন মা, বাবা বা কোনো প্রিয়জনের মৃত্যু হলে, পরিবারে নতুন ছোট ভাই বা বোন জন্মালে , স্কুলে কোনো কারণে ভয় পেলে- যেমন শিক্ষকের অতি রূঢ় আচরণ, বন্ধুর বা সিনিয়রদের হাতে নিগৃহীত বা বখাটেদের উৎপাতের শিকার হলে, স্কুলে কোনো বিশেষ সমস্যা যেমন -বাথরুমে যাওয়া নিয়ে লজ্জ্বা পেলে, পারিবারিক সমস্যা হলে- মা বাবার নিত্য দিনের ঝগড়া, ডিভোর্স বা নিকটজনের যে কোনো ধরণের অসুস্থতা হলে, স্কুলে প্রতিনিয়ত খারাপ ফলাফল করলে বা স্কুলে পড়ার সাথে তাল মিলাতে না পারলে, পরিবারের কোনো সদস্য  শিশুর স্কুলে যাওয়াকে ক্রমাগত নিরুৎসাহিত করলে, সেপারেশন  অ্যাংজাইটিতে ( মা-বাবাকে ছেড়ে থাকা নিয়ে উৎকন্ঠা) , আক্রান্ত হলে শিশু  কোনো ধরণের মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকলে ( যেমন বিষণতা, অতি চঞ্চল অমনোযোগি শিশু, মানসিক প্রতিবন্ধী ইত্যাদি,

শিশুর মধ্যে স্কুলভীতি দেখা দিলে নানা ছলছুতোয় সে স্কুলে যাওয়া থেকে বিরত থাকে আর যদিওবা স্কুলে যায় তবে সেখান থেকে  অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে বাসায় চলে আসে। স্কুলভীতির শিশুদের অন্যতম বৈশিষ্ট হচ্ছে এরা স্কুলের বদলে কেবল বাসায় থাকতেই পছন্দ করে- স্কুল পালিয়ে তারা সাধারণত অন্য কোথাও যায় না। স্কুলে যাবার সময় হলে  পেট ব্যথা , বমিভাব বা বমির চেষ্টা কিংবা  বুক ধরফর, মাথাঘোরা ইত্যাদি সমস্যার কথা বলে সে স্কুলে যাবার সময়টুকু পার করে দেয়- স্কুলে যাবার সময় পার হয়ে গেলে তার  এ সমস্যাগুলোও আর থাকে না। যে সব শিশুদের মধ্যে স্কুলভীতি থাকে  বড় হয়ে তাদের কেউ কেউ  উৎকন্ঠা (অ্যাংজাইটি) বা অহেতুক আতংক (প্যানিক ডিজঅর্ডার) এর মত  মৃদু মানসিক সমস্যায় ভুগতে পারে।  স্কুলভীতি দূর করবার জন্য  বাবা-মা  এবং স্কুলের  শিক্ষক সবারই সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।

 স্কুলভীতি : কী করবেন:

শিশুকে আশ্বস্ত করতে হবে- তাকে স্কুল সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা প্রদান করতে হবে। যদি দীর্ঘদিন ধরে তার মধ্যে স্কুলভীতি থাকে তবে তাকে প্রথমে স্কুল সময়ের বাইরে – যেমন বিকেলের দিকে স্কুলে ঘুরতে নিয়ে যেতে হবে।  এরপর তাকে স্কুলে অবস্থান করা অভ্যাস করাতে হবে- স্কুল সময়ের বাইরে ও স্কুল সময়ের মধ্যে। দিন দিন তার স্কুলে সময় কাটানোর পরিমান বাড়াতে হবে এবং একসময় তাকে পূর্ণ সময়ের জন্য স্কুলে রাখতে হবে।পাশাপাশি  এ সমস্যাটি নিয়ে শিক্ষকের / স্কুল কর্তৃপক্ষের সাথে খোলামেলা আলোচনা করতে হবে। শিক্ষকদের উচিৎ হবে বিষয়টি নিয়ে অভিভাবকের মতামত শোনা ও চিকিৎসকের পরামর্শকে গুরুত্ব দেয়া।

প্রয়োজনে বাড়িতে তাকে স্বাভাবিকের চাইতে একটু বেশি মনোযোগ দিতে হবে। স্কুলের বন্ধুদের সাথে মিশতে দিতে হবে- স্কুলের বাইরে- বাড়িতে এবং স্কুলে। স্কুল বিষয়ক তার মনোভাব জানতে হবে এবং স্কুলে কোনো সমস্যা আছে কিনা- তাকে কেউ বিরক্ত করে কিনা, ঠিকমত সে পড়ালেখার সাথে তার মেলাতে পারছে কিনা সেদিকে নজর দিতে হবে- অযথা তাকে কোনো প্রতিযোগিতার মধ্যে ঠেলে দেয়া যাবেনা- ভালো রেজাল্ট করতেই হবে এমন কোনো টার্গেট বেঁেধ দেয়া চলবে না। শিশুকে সাহস দিতে হবে- এবং তাকে বোঝোতে হবে যে বাব-মা তাকে সত্যিকারের ভালোবাসে। শিশুকে দৈনন্দিন রুটিন মেনে চলার অভ্যাস করাতে হবে- এমন কিছু করা যাবে না যা তাকে চমকে দেয়। অযথা তাকে  সারপ্রাইজ না দেয়াই ভালো। তার স্কুলের সময় বাসায় এমন কোনো অনুষ্ঠানের আয়োজন করা উচিৎ নয় যাতে সে  নিজেকে বঞ্চিতবোধ করে। শিশুর সাথে রাগারাগি মারধোর করা চলবে না বরং স্কুলে গেলে তাকে ছোট ছোট পুরস্কার দেয়া যেতে পারে।প্রয়োজনে স্কুল পরিবর্তণ করা প্রয়োজন হতে পারে॥ সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে যে তার সত্যিকারের কোনো শারীরিক সমস্যা আছে কিনা তার জন্য উপযুক্ত  চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করতে হবে- স্কুলে যেতে না চাওয়া মানেই স্কুলভীতি নয়, অনেকসময় প্রকৃত শারীরিক অসুস্থতার কারণেও সে স্কুলে যেতে অপারগ হতে পারে এ বিষয়টি ভুললে চলবে না। প্রয়োজনে মনোরোগবিশেষজ্ঞ এর সাহায্য নেয়া যেতে পারে।

ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদঃ  

সহকারী অধ্যাপক

চাইল্ড এডোলেসেন্ট এন্ড ফ্যামিলি সাইকিয়াট্রি

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট।

রিপোর্টঃ সীমা আক্তার মেঘলা

টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Note: All are Not copyrighted , Some post are collected from internet. || বিঃদ্রঃ সকল পোস্ট বিনোদন প্লাসের নিজস্ব লেখা নয়। কিছু ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহীত ।