ডা. তানজিনা হোসেন: শিশুদেরও ডায়াবেটিস হয়। হয় কৈশোর বা তারুণ্যে। এক বিশাল সংখ্যক তরুণী গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হন। সত্যি বলতে কি এই রোগ যে কোন বয়সে যে কারো হতে পারে। কিন্তু শিশু কিশোরদের ডায়াবেটিস নিয়ে চিন্তার অবকাশ দিন দিন বাড়ছে। কেননা বছরে প্রায় ৩ শতাংশ হারে বেড়ে চলেছে শিশুদের ডায়াবেটিস। আর যেহেতু এই আক্রান্ত শিশুরা জীবনের একটি বড় সময় জুড়ে রক্তে শর্করার আধিক্যে ভোগে, পরিণত বয়সে এদের হৃদরোগ, কিডনি জটিলতা, অন্ধত্ব বা পা হারানোর মত জটিলতার সম্ভাবনাও অনেক বেশি থাকে। ফলে একটি শিশুর ডায়াবেটিস হওয়া মানে একটি সম্ভাবনার অংকুরে দুর্ঘটনা, দেশ ও দশের অপুরণীয় ক্ষতির আশংকা।

শিশুদের ডায়াবেটিস কেন?

সাধারণত কম বয়সে ও শিশু বয়সে যে ডায়াবেটিস হয় তা টাইপ ১ ডায়াবেটিস নামে পরিচিত। জন্মগত ও পরিবেশগত নানা কারণে এই ডায়াবেটিস হয়। এতে এক ধরণের ইমিউন সিস্টেম জটিলতায় দেহের অগ্ন্যাশয়ের বিটা কোষগুলো দ্রুত ধ্বংস হয়ে ইনসুলিন উৎপাদনের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। ফলে বাকি জীবন এই শিশুটিকে ইনসুলিনের ওপর নির্ভর করেই বেঁচে থাকতে হয়। তবে আমাদের দেশে টাইপ ১ ডায়াবেটিসের প্রকোপ অনেক কম।

আবার সাধারণত বড়দের মধ্যে দেখা যাওয়া টাইপ ২ ডায়াবেটিসও বর্তমানে কিশোর কিশোরী ও তরুণদের মধ্যে বেড়ে যাচ্ছে। শিশু কিশোরদের মধ্যে ইদানীং ওজন বৃদ্ধির প্রবণতা অত্যাধিক হারে বেড়েছে, বেড়েছে ফাস্ট ফুড, কোমল পানীয় ও জাংক ফুডের প্রতি আসক্তি, সমান তালে কমছে খেলাধূলার বা কায়িক শ্রমের সুযোগ। কম্পিউটার বা টেলিভিশনের সামনে বসে সময় কাটানোর অভ্যেসও ওজন বাড়ার জন্য দায়ী। সব মিলিয়ে যে রোগ হবার কথা চল্লিশ বছর বা তারও পরে, সেই রোগে কৈশোরে বা তারুণ্যেই আক্রান্ত হচ্ছে এরা। ওজনাধিক্য ও স্থুল মেয়েশিশুরা কৈশোরে ডায়াবেটিসের সাথে আক্রান্ত হচ্ছে পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম নামের আরেক ধরণের জটিল সমস্যায়। অল্প বয়সে ডায়াবেটিস হবার পেছনে মাতৃগর্ভে অপুষ্টি ও কম ওজনের ভুমিষ্ঠ হবার ইতিহাসও গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া জন্মগত কিছু রোগ এবং হরমোনজনিত কিছু সমস্যায় অল্প বয়সেই ডায়াবেটিস দেখা দিতে পারে। কিছু তরুণ তরুণী অগ্ন্যাশয়ে পাথর হবার কারণে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয় যা চিকিৎসা বিজ্ঞানে ফাইব্রো ক্যালকুলাস প্যানক্রিয়েটিক ডিজিজ নামে পরিচিত। তাই শিশু কিশোর বয়সে ডায়াবেটিস বহুমাত্রিক বৈশিষ্ট্যপূর্ণ হতে পারে। এদের চিকিৎসাও তাই সমান ভাবে চ্যালেঞ্জিং।

শিশুদের ডায়াবেটিস চিকিৎসা

এখন পর্যন্ত ইনসুলিনই শিশুদের উপযোগী একমাত্র নির্ভরযোগ্য ও নিরাপদ চিকিৎসা। যদিও কৈশোরে (১০ বছর বয়সের ওপর) ওজনাধিক্য বা স্থুল টাইপ ২ ডায়াবেটিক শিশুকে মেটফরমিন ওষুধ দিয়েও চিকিৎসা করা হয়ে থাকে। একেক বয়সে শিশুদের জীবনে একেক পর্যায় পার করতে হয়, পাল্টে যায় জীবনযাত্রা ও মানসিকতা; এর সাথে পাল্লা দিয়েই চলবে তার ডায়াবেটিসের চিকিৎসা। শিশুদের চিকিৎসায় অভিভাবক, স্কুলের শিক্ষক শিক্ষিকা, প্রতিবেশি এমনকি বন্ধু বান্ধবদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভ’মিকা রয়েছে। একটি বিশেষ বয়সের পর ধীরে ধীরে ইনসুলিন ব্যবহার, রক্তে শর্করা পরিমাপ করা, নিজের সমস্যা ও জটিলতা দ্রুত শনাক্ত করার দক্ষতা অর্জন করতে শিশু কিশোরদের পর্যায়ক্রমে শিক্ষিত করে তুলতে হয়। শিশুর সঠিক পরিমিত ও সময়নুবর্তি খাদ্যভ্যাস গড়ে তোলা, খেলাধূলা সহ স্বাভাবিক জীবন যাপনে মানিয়ে নেবার প্রচেষ্টা এবং বিপদ চিনে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নিতে পারার প্রশিক্ষণ-এই সবই তার চিকিৎসার আওতায় পড়ে। ডায়াবেটিস একটি জীবনব্যাপী ও দীর্ঘমেয়াদী অবস্থা, তাই এ রোগে মানসিক বিপর্যস্ততার আশংকাও বেশি। শিশু কিশোরদের প্রতি পূর্ণ সমর্থন, ইতিবাচক আচরণ ও সহানুভ’তিশীল মনোভাব ছাড়া তাই তাদের এ অবস্থায় পূর্ণ বিকাশ অসম্ভব।

ভবিষ্যত প্রজন্মকে রক্ষা করতে হবে

বিজ্ঞানীদের মতে টাইপ ২ ডায়াবেটিস ৭০ শতাংশ প্রতিরোধযোগ্য। আর তার জন্য চাই জীবনযাপনে ও অভ্যেসে ইতিবাচক পরিবর্তন। আজকে যে শিশু বা কিশোর, তার ভবিষ্যতকে স্বাস্থ্যকর ও নিরাপদ করে তুলতে এই পরিবর্তন এখনই আনতে হবে। শৈশবে যারা ওজনাধিক্য ও স্থুলতায় ভোগে, তাদের ভবিষ্যতে ডায়াবেটিস হবার ঝুঁকি অনেক বেশি। সঠিক পুষ্টিকর ও স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে শিশুদের ছোটবেলা থেকেই সচেতন করে তুলতে হবে। বর্জন করতে হবে ফাস্টফুড, কোমল পানীয়, প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের প্রতি আসক্তি। বাড়িতে তৈরি, পুষ্টিকর খাবার ও টিফিনে তাদের অভ্যস্ত করুন, প্রচুর শাক সব্জি, ফলমূল ও আঁশযুক্ত খাবারের প্রতি উৎসাহিত করুন। প্রতিদিন নিয়ম করে খেলাধূলা বা কায়িক শ্রম করা জরুরি। স্কুলে, পাড়ায়, শহরের আবাসিক এলাকায় খোলা মাঠ ও পার্ক বা শিশুদের খেলার জায়গার জন্য সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার সময় এসেছে। ভবিষ্যত প্রজন্মকে রক্ষা করার তাগিদ থেকেই তা আমাদের করতে হবে।

রিপোর্টঃ সীমা আক্তার মেঘলা

টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Note: All are Not copyrighted , Some post are collected from internet. || বিঃদ্রঃ সকল পোস্ট বিনোদন প্লাসের নিজস্ব লেখা নয়। কিছু ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহীত ।