বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গত বছর বলিউডের ছবি ‘চিলড্রেন অব ওয়ার’ তৈরি করেছিলেন মৃত্যুঞ্জয় দেবব্রত। সম্প্রতি যশরাজ ফিল্মসের ‘গুন্ডে’ ছবিতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে অবমাননা করার পাশাপাশি ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ ওঠার পর সমালোচনায় মুখর হয়েছেন ভারতীয় এ চলচ্চিত্র নির্মাতা।

১৯৭১ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ভয়াবহ গণহত্যা চালায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। এ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বহু নারী ধর্ষণের শিকার হন যাঁরা অসংখ্য যুদ্ধশিশুর জন্ম দেন। গণহত্যা ও যুদ্ধশিশুর বিষয়বস্তু নিয়ে গত বছর ‘দ্য বাস্টার্ড চাইল্ড’ ছবি তৈরি করেন মৃত্যুঞ্জয়। কিন্তু শিরোনামের কারণে শুরুতে বিতর্কের মুখে পড়ে ছবিটি। ভারতের সেন্সর বোর্ডের আপত্তির কারণে শেষ পর্যন্ত ছবির নাম পাল্টে ‘চিলড্রেন অব ওয়ার’ রাখেন মৃত্যুঞ্জয়। ছবিটির বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন রাইমা সেন, ঋদ্ধি সেন, তিলোত্তমা সোম, পবন মালহোত্রা, ইন্দ্রনীল সেনগুপ্ত, ভিক্টর ব্যানার্জি, প্রয়াত ফারুখ শেখ প্রমুখ।গুন্ডে

১৪ ফেব্রুয়ারি মুক্তি পাওয়া ‘গুন্ডে’ ছবিতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে ভুল তথ্য উপস্থাপিত হওয়ায় কড়া সমালোচনা করেছেন মৃত্যুঞ্জয়। ছবিটি সম্পর্কে তাঁর মন্তব্য, ‘আমার যদি সত্য বলার অনুমতি থাকে তবে আমি বলব, অসত্য তথ্য উপস্থাপন করেছেন ‘‘গুন্ডে’’ ছবির নির্মাতারা। এ ধরনের বাণিজ্যিক ছবির একমাত্র উদ্দেশ্য বক্স অফিস থেকে কাঁড়ি কাঁড়ি অর্থ উপার্জন করা। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মতো সংবেদনশীল একটি বিষয় বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করাটাই অনৈতিক। আর ইতিহাসকে ভুলভাবে উপস্থাপনের বিষয়টি দায়িত্বজ্ঞানহীনতা ও অশ্রদ্ধা প্রকাশ করা ছাড়া আর কিছুই না।’

মৃত্যুঞ্জয় আরও বলেন, ‘ইতিহাস সব সময় ইতিহাসই থাকে। কোনোভাবেই একে পরিবর্তন করা যায় না। ভুল তথ্যের ওপর ভিত্তি করে লেখা কোনো বই বা চলচ্চিত্র ইতিহাসকে বদলে দিতে পারে না। অশুদ্ধ ইতিহাস তুলে ধরার দায়ে দুষ্ট চলচ্চিত্র মানুষ মনে রাখে না। খুব দ্রুতই তা বিস্মৃত হয়ে যায়। আমি শুনেছি, ‘‘গুন্ডে’’ ছবির অভিনেত্রী প্রিয়াঙ্কা চোপড়া নাকি একটি টিভি অনুষ্ঠানে বলেছেন, ১৯৭১ সালের যুদ্ধ ভারত ও বাংলাদেশকে বিভক্ত করেছিল। বলিউডের এমন অজ্ঞতার বিষয়টি সত্যিই অবিশ্বাস্য। আমার ধারণা, বিষয়টি নিয়ে ভারতের চলচ্চিত্র দর্শকরাও ক্লান্ত ও বীতশ্রদ্ধ।’

অবশ্য বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে মানুষের মধ্যে চর্চা বেড়ে যাওয়ায় বেশ খুশি মৃত্যুঞ্জয়। এ প্রসঙ্গে তাঁর ভাষ্য, ‘আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় এখন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিষয়টি অনেক বেশি মানুষ জানতে পেরেছেন। কিন্তু ‘‘গুন্ডে’’ ছবিতে ভুল ইতিহাস তুলে ধরে নির্মাতারা যে ধরনের অসতর্কতার পরিচয় দিয়েছেন তাতে আমি খুবই বিচলিত।’ সম্প্রতি এক খবরে এমনটিই জানিয়েছে বলিউডহাঙ্গামা ডটকম।

‘গুন্ডে’র কারণে মৃত্যুঞ্জয় পরিচালিত ‘চিলড্রেন অব ওয়ার’ ছবিটি কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে কি না জানতে চাইলে মৃত্যুঞ্জয় বলেন, ‘আমি শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, কোনো বাজে ছবি আমাদের কোনো রকম ক্ষতি করতে পারবে না। অনেক পরিশ্রম আর ভালোবাসা দিয়ে ‘‘চিলড্রেন অব ওয়ার’’ ছবিটি তৈরি করেছি আমরা। এর মাধ্যমে ১৯৭১ সালে সংঘটিত ন্যক্কারজনক গণহত্যার সত্য গল্প তুলে ধরা হয়েছে যা ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষের বিবেককে প্রচণ্ডভাবে নাড়া দিয়েছিল। আমার বিশ্বাস, ছবিটি দেখার পর খুব সহজে তা ভুলে যেতে পারবেন না দর্শকেরা।’

প্রসঙ্গত, যশরাজ ফিল্মসের ‘গুন্ডে’ ছবিটি ১৪ ফেব্রুয়ারি বলিউডে হিন্দি ভাষার পাশাপাশি কলকাতায় বাংলা ভাষায় মুক্তি দেওয়া হয়। ছবিটির শুরুর দিকে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন ভিডিও চিত্র দেখানোর পাশাপাশি হিন্দি ভাষায় বলা হয়, ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর হিন্দুস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যে তৃতীয় যুদ্ধ শেষ হয়। ৯০ হাজার পাকিস্তানি সেনা হিন্দুস্তানের সেনাদের সামনে আত্মসমর্পণ করেন। জন্ম হয় এক নতুন দেশ, বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে এভাবে বিকৃত করায় ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ রক্ষার বিভিন্ন ওয়েবসাইট ও ব্লগে সমালোচনার ঝড় ওঠে। পাশাপাশি আইএমডিবি সাইটে কড়া মন্তব্য করে রিভিউ লেখেন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের অসংখ্য মানুষ। অসত্যের বিরুদ্ধে এমন অভিনব প্রতিবাদের কল্যাণে আইএমডিবি রেটিংয়ে সর্বনিম্ন পয়েন্ট পায় ‘গুন্ডে’। বর্তমানে মাত্র ১.২ পয়েন্ট নিয়ে আইএমডিবি বটম হান্ড্রেড চার্টের এক নম্বরে অবস্থান করছে ‘গুন্ডে’ ছবিটি। ২ ও ৩ নম্বরে রয়েছে হলিউডের দুই ছবি ‘দ্য হটি অ্যান্ড দ্য নটি’ (১.৮ পয়েন্ট) এবং ‘ডিজাস্টার মুভি (১.৯ পয়েন্ট)।

‘গুন্ডে’ ছবি নিয়ে সমালোচনা ও প্রতিবাদের ঝড় ওঠায় ক্ষমা চায় যশরাজ ফিল্মস। প্রতিষ্ঠানটির ফেসবুক ফ্যানপেজে লেখা এক বার্তায় বলা হয়, ‘প্রিয় বন্ধুরা, আমাদের ছবিতে যেভাবে গল্প তুলে ধরা হয়েছে তাতে বাংলাদেশের অনেক ভাই তাঁদের আপত্তির কথা জানিয়েছেন। ছবিটির কাহিনি ও গল্প পুরোপুরি কাল্পনিক। কোনো জাতি, সমাজের বিশেষ কোনো গোত্র কিংবা ব্যক্তির প্রতি অশ্রদ্ধা প্রদর্শনের অভিপ্রায় আমাদের ছিল না। তারপরও বাংলাদেশি ভাইরা যদি আমাদের কাজ দেখে আহত হন কিংবা অশ্রদ্ধা প্রকাশ করা হয়েছে বলে মনে করেন তাহলে আন্তরিকভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করছি আমরা।’

ওই বার্তায় আরও বলা হয়, ‘ছবিটির কাল্পনিক গল্পের কারণে কারও অনুভূতিতে যদি আঘাত লেগে থাকে তবে তার দায়ভার পুরোটাই আমরা নিচ্ছি। আমাদের অসাবধানতার কারণেই এমনটা হয়েছে। আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই, কারও মনে আঘাত দেওয়ার উদ্দেশ্য আমাদের ছিল না। তারপরও কেউ যদি আঘাত পেয়ে থাকেন তবে আবারও আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি আমরা।’

টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Note: All are Not copyrighted , Some post are collected from internet. || বিঃদ্রঃ সকল পোস্ট বিনোদন প্লাসের নিজস্ব লেখা নয়। কিছু ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহীত ।