দিগন্তজুড়ে হলুদ রং। সরষে ফুলের হলুদ ছুঁয়েছে দিগন্ত। নয়নাভিরাম চোখজুড়ানো সেই ক্ষেতগুলোতে সারি সারি মৌমাছির মৌবাক্স। কান পাতলে শোনা যায়, মৌমাছিদের মৃদু গুন গুন শব্দ। ঝাঁকে ঝাঁকে মৌমাছি উড়ে গিয়ে সরষে ফুলে বসছে। কিছুক্ষণ পর পর আবার বাক্সে ফিরছে মধু নিয়ে। আর এখন মধু সংগ্রহের সময়, তাই মাসজুড়েই চলবে ফুলের মধু সংগ্রহের উৎসব।sorisa

প্রাকৃতিক উপায়ে মধু সংগ্রহের ফলে শুধু মৌচাষিরাই লাভবান হন তাই নয়, সরষে ক্ষেতে পর্যাপ্ত মৌমাছি বিচরণ করায়, সঠিক পরাগায়ন (পলিনেশন) ঘটায় সরষের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ে। লাভবান হন কৃষকরাও। পরিবেশও উপকৃত হয় ক্ষেতে কীটনাশক ব্যবহার কম হওয়ায়।

মৌচাষি আবদুল হালিম মিয়া জানান, ‘১০ বছর ধরে সরিষা থেকে মধু সংগ্রহের কাজ করছি। মধু সংগ্রহে যে মৌমাছি ব্যবহার করা হয়, এরা আমাদের দেশি মৌমাছি না। এফিসমেলিফ্রা জাতের অস্ট্রেলিয়ান মৌমাছি দিয়ে মধু সংগ্রহ করা হয়। মৌমাছিগুলো পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত থেকে আনা হয়।

মৌ-শ্রমিক শাহাদাত হোসেন জানান, মধু সংগ্রহে সুপার চেম্বার, বুরট, নিউক্লিয়াস নামের বাক্স ব্যবহার করা হয়। বাক্সগুলো সরিষা ক্ষেতের কাছে রাখলে মৌমাছিরা মধু এনে বাক্সে জমা করে। প্রতিটি বাক্স থেকে তিন-চার কেজি মধু পাওয়া যায়। সপ্তাহে একদিন মধু সংগ্রহ করা হয়। প্রতি কেজি মধু ১০০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি করা হয়। প্রতিটি খামারে তিন থেকে পাঁচজন শ্রমিক কাজ করেন।

শ্রমিকরা মাসিক ১ থেকে পাঁচ হাজার টাকা করে বেতন পান। মানিকগঞ্জ থেকে এই শীতে প্রায় কয়েক কোটি টাকার মধু সংগ্রহ হবে বলে জানালেন সংশ্লিষ্ট মৌচাষিরা। সরিষা ফুল থেকে মধু সংগ্রহের কাজটাকে আরো বৃহৎ পরিসরে করতে

পারলে এটি দেশের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখতে পারবে বলে মৌচাষিরা মনে করেন।

তবে কাঠের বাক্সে আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পালন করা যায় মৌমাছি। মৌচাক থেকে সংগ্রহ করা যায় মধু। মৌচাক থেকে পাওয়া মোম অনেক শিল্পের কাঁচামাল ও বিকল্প জ্বালানি তৈরিতে বেশ কাজে লাগে। পুরান ঢাকার সুরিটোলার ৫০ বছরের অভিজ্ঞ মৌচাষি বেলায়েত হোসেন জানান, সরিষা, তিল, লিচু, কুলসহ বিভিন্ন ফুল, ফল ও ফসল বেশি আবাদ হয় এমন এলাকা মৌচাকের জন্য সবচেয়ে উপযোগী। উপযুক্ত সময় শীতকালের শুরু থেকে বসন্ত পর্যন্ত। জানা যায়, ‘অ্যাপিস মেলিফেরা’ প্রজাতির মৌমাছি আমাদের দেশে বাক্সে পালনের জন্য সবচেয়ে উপযোগী। ‘অ্যাপিস সেরানা’ প্রজাতির মাছিও বাক্সে সহজে পোষ মানে। কিন্তু এদের মধু উৎপাদন ক্ষমতা কম। একটি রানি মাছি, কিছু পুরুষ মাছি এবং অসংখ্য কর্মী মৌমাছির সমন্বয়ে গঠিত হয় একটি মৌ-কলোনি। বিসিক দিনাজপুর কেন্দ্রের কর্মকর্তা জানান, মৌবাক্স রাখার স্থানটি হতে হবে ছায়াযুক্ত ও শুকনো। বিকট শব্দ সৃষ্টিকারী ও ধোঁয়া উৎপাদনকারী কোনো কিছু যাতে কাছে না থাকে সে বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে। মথ পোকা, পিঁপড়া, ইঁদুর, পাখি, ফড়িং মৌমাছির ক্ষতিসাধন করে। এদের থেকে মৌমাছিকে সুরক্ষিত রাখতে হবে। এছাড়া কোনো উদ্যোক্তা যদি প্রশিক্ষণ নিয়ে পাঁচটি মৌ-কলোনি সংবলিত মৌ-খামার স্থাপন করতে চায় তার জন্য প্রাথমিক ব্যয় হবে ৩২ থেকে ৩৫ হাজার টাকা। খরচটা হয় মূলত প্রথম বছরই। ভালো কাঠের একটি মৌবাক্স ১০ থেকে ১২ বছর পর্যন্ত ব্যবহার করা যায়।

আয়ের ব্যাপারটা প্রথম বছর প্রতিটি মৌবাক্স থেকে গড়ে ৩০ থেকে ৩৫ কেজি পর্যন্ত মধু পাওয়া যাবে। প্রতি কেজি মধুর খুচরা বাজারমূল্য প্রায় ৩০০ টাকা। সে হিসাবে ৫টি মৌবাক্স থেকে পাওয়া যাবে ১৫০ কেজি মধু, যার দাম প্রায় ৪৫ হাজার টাকা। দ্বিতীয় বছর থেকে মধুর উৎপাদন বাড়ে, রক্ষণাবেক্ষণ বাদে আর কোনো খরচও থাকে না। সে হিসাবে দ্বিতীয় বছর থেকে লাভ থাকবে প্রায় পুরোটাই। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা থাকলে মৌচাষের মাধ্যমে মধু সংগ্রহ করে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রফতানি করে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা যাবে বলে জানান মৌচাষিরা।

টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Note: All are Not copyrighted , Some post are collected from internet. || বিঃদ্রঃ সকল পোস্ট বিনোদন প্লাসের নিজস্ব লেখা নয়। কিছু ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহীত ।