ডা. মামুন আল-মাহতাব (স্বপ্নীল ): পৃথিবী জুড়ে লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যান্সারের প্রধান কারণ হেপাটাইটিস সি ভাইরাস। পাশ্চাত্যে বেশির ভাগ লিভার ট্রান্সপ্লান্টেশনই করা হয়ে থাকে হেপাটাইটিস সি ভাইরাস জনিত লিভার রোগের কারণে। অথচ ১৯৮৯ সালে হেপাটাইটিস সি ভাইরাস আবিষ্কৃত হওয়ার আগ পর্যন্ত মানুষের এই ভাইরাস সম্বন্ধে কোন ধারণা ছিলনা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী পৃথিবীতে হেপাটাইটিস সি ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা ১৭-২০ কোটি যা পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ৩%আর এই সংখ্যাটি বিশ্বের এইডস রোগীর চেয়ে চারগুন বেশী। বাংলাদেশে প্রায় ৪০ লক্ষ লোক এই ভাইরাসে আক্রান্ত। তবে পাশ্চাত্যে এবং বিশেষ করে ভূ-মধ্যসাগরীয় অঞ্চলে হেপাটাইটিস সি এর প্রাদুর্ভাব অনেক বেশীপ্রতি বছর পৃথিবীতে প্রায় ৩০-৪০ লক্ষ লোক এ ভাইরাসে নতুন করে আক্রান্ত হচ্ছেন। ব্লাড ট্রান্সফিশনের পূর্বে তা হেপাটাইটিস সি ভাইরাস মুক্ত কি না সেটি যথাযথভাবে পরীক্ষা করার কারণে উন্নতবিশ্বে যখন হেপাটাইটিস সির সংক্রমন এক দিকে কমে আসছে, অন্যদিকে বাংলাদেশের মত উন্নয়শীল দেশগুলোতে তা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

হেপাটাইটিস সি ভাইরাস মূলত ছড়ায় রক্তের মাধ্যমে। দূষিত সিরিঞ্জ ব্যবহারের মাধ্যমে, বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বে অনেকেই নিজেদের অজান্তে এ রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ছেন। তাছাড়া একই সেভিং রেজার, ব্লেড কিংবা ক্ষুর ব্যবহারে মাধ্যমেও ভাইরাসটি ছড়াতে পাড়ে। তবে স্ত্রী সহবাসের মাধ্যমে অথবা গর্ভস্থ শিশুর হেপাটাইটিস সি ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। সামাজিক মেলামেশা যেমন হ্যান্ডসেক বা কোলাকুলি এবং রোগীর ব্যবহার্য সামগ্রী যেমন গ্লাস,চশমা, তোয়ালে, জামা-কাপড় ইত্যাদির মাধ্যমে এ রোগ ছড়ায় না

শরীরে একবার হেপাটাইটিস সি ভাইরাস প্রবেশ করলে তা শতকরা ৮৫ ভাগ ক্ষেত্রে লিভারে স্থায়ী ইনফেকশন তৈরি করে যাকে আমরা বলে থাকি ক্রনিক হেপাটাইটিস সিএ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরেরোগের কোন লক্ষণ থাকে না বললেই চলেঅথচ ১০১৫ বছরের মধ্যে এদের প্রায় অর্ধেকই লিভার সিরোসিসের মত মারাত্নক রোগে আক্রান্ত হন, যাদের অনকেরই পরবর্তীতে লিভার ক্যান্সার দেখাদেয়আর তাই হেপাটাইটিস সিকে বলাহয়ে থাকে তুষের আগুন’– যা ভিতরে ভিতরে পুরিয়ে ছার খার করে ফেললেও, বাইরে থেকে তা বোঝা যায়না

মহিলা এবং অল্প বয়স্কদের লিভার হেপাটাইটিস সি তুলনা মূলকভাবে কম ক্ষতি করে থাকেঅন্যদিকে যারা অ্যালকোহল সেবন করেন তারা হেপাটাইটিস সি ভাইরাসে আক্রান্ত হলে তাদের লিভারে মারাত্বক রোগ সৃষ্টির আশঙ্কা খুবই বেশী

হেপাটাইটিস সিকে অনেকে নীরব ঘাতক বলে থাকেনকারণ এর বিরুদ্ধে কার্যকর কোন ভ্যাকসিন নেইতবে চিকিৎসায় হেপাটাইটিস সি ভাইরাস শতকরা ৭০৯০ ভাগ ক্ষেত্রেই নিরাময় যোগ্যসত্যি বলতে কি সাধারণ ইনফ্লুয়েঞ্জা বা সর্দিকাশির ভাইরাসের বিরুদ্ধে কোন ঔষধ না থাকলেও, হেপাটাইটিস সি ভাইরাসের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ঠিক উল্টোআর সুখবর এই যে, এ রোগের অন্যতম প্রধান ঔষধ পেগাসিস উন্নত বিশ্বের মত বাংলাদেশেও পাওয়া যায়  আর অন্য ঔষধ রিবাভিরিণতো এখন বাংলাদেশেই তৈরি হচ্ছেআর তাই প্রত্যেক সচেতস ব্যাক্তির উচিত শরীরে হেপাটাইটিস সির জীবাণু আছে কি না তা পরীক্ষা করে জেনে নেয়া আর থাকলে দ্রুত লিভার বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হওয়াতেমনি হেপাটাইটিস সি আক্রান্ত রোগীর উচিত লিভার বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা গ্রহণ করার পাশাপাশি রক্ত দান, অঙ্গ ও কর্ণিয়া দানআর সেলুনে সেভ করা থেকে বিরত থাকা

ডা. মামুন আল-মাহতাব (স্বপ্নীল )
সহযোগী অধ্যাপক, লিভার বিভাগ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

 

টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Note: All are Not copyrighted , Some post are collected from internet. || বিঃদ্রঃ সকল পোস্ট বিনোদন প্লাসের নিজস্ব লেখা নয়। কিছু ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহীত ।