” চীলেশন থেরাপি”

ডাঃ গোবিন্দ চন্দ্র দাস: বর্তমান আমেরিকায় সকল পঙ্গুত্ব ও মৃত্যুর শতকরা পঞ্চাশ ভাগেরই কারণ হলো হৃদরোগ। এক পর্যায়ে একযোগে চার কোটিরও বেশি নারী-পুরুষের ভেতর হৃদরোগের লক্ষণ প্রকাশ পায়, আর এই রোগ ছিল দেশের এক নম্বর। হৃদরোগ এখনও ব্যাপক হারে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দশ লক্ষাধিক মানুষ এই রোগে মারাও পড়ছে ফিবছর। বহু লোক কোনো আগাম সতর্কতা ছাড়াই শারীরিকভাবে ভেঙে পড়ছে, অসহ্য যন্ত্রণার মধ্যে পতিত হচ্ছে, অ্যানজিনায় দুর্বল হয় পড়ছে এ সবই স্পষ্ট সংকেত দেয় যে হৃদপি-ের কিছু এলাকায় করোনারি আর্টারি রক্ত সরবরাহ করছে না। বাংলাদেশেও এ রোগের প্রকোপ অনেক বেশী ।

অ্যানজিনা পেকটোরিস সংক্ষেপে অ্যানজিনা বা ‘বুক-ব্যথা’ হিসেবে পরিচিত। আসলে করোনারি ধমনীতে ব্লকেজ থাকলে রক্ত চলাচল বাধাপ্রাপ্ত হয় বলে বুকে এই ব্যথা অনুভূত হয়। করোনারি আর্টারি বাইপাস সার্জারি বা গ্রাফটিং হলো সেই পদ্ধতি যার মাধ্যমে রোগীর পায়ের শিরা কেটে নিয়ে হার্টের ব্লক হয়ে যাওয়া ধমনীর বিকল্প পথ তৈরি করে দেয়া হয়। যাতে হৃৎপি-ের ধমনীতে রক্ত চলাচল অব্যাহত থাকে। হৃদরোগ চিকিৎসায় বেলুনিং বা এনজিওপ্লাস্টি বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। ১৯৬৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় অর্ধ কোটি হৃদরোগী বাইপাস সার্জারি করিয়েছেন। এবং সমান সংখ্যক এ্যানজিওপ্লাষ্টিও ।

প্রচারণা ও প্রভাব দেখে আপাতদৃষ্টিতে এমন ধারণা হওয়া খুবই স্বাভাবিক যে হৃদরোগ হলে এনজিওপ্লস্টি বা বাইপাস সার্জারি চিকিৎসাই হচ্ছে এর নির্ভরযোগ্য উপশম। এই যুগে তেমনটাই ভেবে থাকেন মানুষ। কিন্তু গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে যে পদ্ধতিগুলো ততোটা নিরাপদ নয়, একইভাবে রোগ নিরাময়েও যে যথেষ্ট কার্যকর তার চূড়ান্ত প্রমাণ মেলে না। না, আমাকে ভুল বোঝার কোনো কারণ নেই, আমি বাইপাস সার্জারি বা এনজিওপ্লাস্টিকে সম্পূর্ণভাবে উড়িয়ে দিচ্ছি না। অনেকেই বিরোধিতা করেন ওই ঝুঁকিপূর্ণ ও অত্যন্ত ব্যয়বহুল চিকিৎসা পদ্ধতি গ্রহণ করার ব্যাপারে। একটু ভেবে দেখুন, ভিন্ন উপায় আছে, যা অত্যন্ত নিরাপদ ও স্বল্পব্যয়ী। এর নাম চীলেশান থেরাপি। একবার এই থেরাপিতে অভ্যন্ত হওয়ার পর বহু হৃদরোগীই আর অপারেশনে সম্মতি দেন না। সে প্রয়োজনই আর হয়নি। আমিও বাইপাস সার্জারির পরামর্শ দিয়েছি এমন কিছু রোগীকে যাদের অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটেছে বা যাদের তাৎক্ষণিক ঝুঁকি ছিল, হার্ট অ্যাটাকের আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল। তাই হৃদরোগ প্রতিরোধের জন্য এই চীলেশান থেরাপিকে অনেকেই অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে। যারা একবার অপারেশন করিয়েছেন তাদের যেন দ্বিতীয়বার অপারেশন করতে না হয় সে কারণেও এই থেরাপির কথা জোরালোভাবে বলা হয়। এক বা দুই ব্লকেজের জন্য এ্যানজিওপ্লাষ্টি এবং একাধিক ব্লকেজের জন্যে বাইপাস সার্জারির চিকিৎসা দেয়া হয়ে থাকে। কিন্তু যখন সেই ব্লকেজের সংখ্যা অনেক হয় তখন? ব্যথা হলে আমরা এসপিরিন গ্রহণ করে থাকি। বাইপাস সার্জারি অত্যন্ত ব্যয়বহুল এক সার্জিক্যাল এসপিরিনের সঙ্গে তুলনীয়। যন্ত্রণা দূর হয় বটে, কিন্তু রোগ নির্মূল হয় না।

বাস্তবতা হলো বাইপাস সার্জারির পর দুই থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত রোগীরা তীব্র বুক-ব্যথা অনুভব করেন না। ফলে তারা ভাবেন যে তাদের রোগ সেরে গেছে। পুনরায় তারা ফিরে যেতে চান পুরাতন সেই জীবনযাপনে যা ছিল না স্বাস্থ্যগত বিচারে যথেষ্ট মানসম্পন্ন। তারা একবারও ভাবেন না যে তাদের বিপদ কেটে যায়নি। এনজিওপ্লাস্টি ও বাইপাস সার্জারিতে যথেষ্ট ঝুঁকি আছে, এর বেশ কিছু সীমাবদ্ধতাও আছেÑ এসব জেনেও মানুষ কেন অপারেশনের দিকে ঝোঁকেন? এর সহজ উত্তর হলো, বস্তুগত বিচারের ফলাফল বিবেচনার চাইতে এর তাৎক্ষণিক কার্যকারিতার বিষয়টিকে বেশি গুরুত্ব দেন তারা। তাছাড়া আমাদের এই চীলেশানথেরাপি সম্পর্কে তারা জানতে পারেন না বলেই উপায়হীনভাবে অপারেশন করান।

‘আমি কোনটা বেছে নেব? এটা রোগীদের একটা কমোন প্রশ্ন। ‘ডাক্তারের আর কোনো পরামর্শ নেই’।

ধমনীতে মিশে যেতে পারে এমন ওষুধ যেমন নাইট্রোগ্লিসারিন এনজিনা বা বুকের ব্যথা সারাতে সাহায্য করে। তবে রক্ত যাদের পাতলা, অর্থাৎ হিমোগ্লোবিনের মাত্রা কম, তাদের জন্যে এটা বিপদ ডেকে আনতে পারে। বেটা ব্লকার্স এবং ক্যালসিয়াম এন্টাগনিস্ট কিছু উপকারে আসে যদিও তার গ্রহণযোগ্যতা শাশ্বত নয়। আর সত্যি বলতে কি এর ভেতর সবচাইতে শক্তিশালী যেটিÑ চীলেশান-এর নাম কেউ উল্লেখই করেন না। হৃদরোগীদের কোনো চয়েজই দেয়া হয় না। এটা মস্ত বড় ভুল। চীলেশানথেরাপি বিনা অপারেশনের একটি চিকিৎসা পদ্ধতি যা মেটাবলিকের উন্নতি ঘটায় এবং নানাভাবে রক্তসঞ্চালন প্রক্রিয়াকে গতিশীল রাখে। একইসঙ্গে দেহে ধাতব আয়নে সামঞ্জস্য নিয়ে আসে, ক্ষতিকর পদার্থ বের করে দেয়। এই থেরাপির জন্যে ব্যয়বহুল হাসপাতালে ভর্তি হওয়া লাগে না, ডাক্তারের চেম্বারেই গ্রহণ করা সম্ভব।

একটি জরিপে দেখা গেছে যে, সর্বশেষ স্বাস্থ্য তথ্য সম্পর্কে যারা খোঁজখবর রাখেন তাদের খুব সামান্য অংশই এই চীলেশানথেরাপি সম্মন্ধে শুনেছেন। এর অনেকেই আবার জানেন ভাসা-ভাসা। একজনই কেবল জেনেছেন যে, চীলেশানথেরাপি বাইপাস সার্জারির নিরাপদ ও কার্যকর বিকল্প হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। সম্ভবত মেডিক্যাল সায়েন্সে যেসব বিষয় অত্যন্ত গোপন রাখা হয়েছে তাদের ভেতর এই চীলেশানথেরাপি অন্যতম। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যেসব রোগী হৃদরোগের বিকল্প চিকিৎসা হিসেবে এই চীলেশানথেরাপি গ্রহণ করেছেন তাদের ভেতর সাফল্যের হার খুবই সন্তোষজনক। এই থেরাপি লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে যারা বিভিন্ন বয়সজনোচিত ব্যাধিতে ভুগছিলেন। নিরাময়-অযোগ্য বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় চীলেশানথেরাপি তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা যে রাখছে তার প্রমাণ মিলেছে।

চীলেশানথেরাপি প্রয়োগকারী সন্তুষ্টি প্রকাশের বদলে বিহ্বলবোধ করেছেন একাধিক রোগের লক্ষণ প্রকাশের পরও সেগুলোর উন্নতি ঘটতে দেখে। এগুলোর ভেতর রয়েছে : এনজিনা, স্ট্রোক, হার্ট ফেইলিওর, আর্থেরাইটিস, ডায়াবেটিস ইত্যাদি। একবার ইডিটিএ রক্তধারায় মিশে গেলে তা রক্তে অতিরিক্ত মৌলিক পদার্থ জমতে বাধা দেয়, দেহকোষ ও প্রত্যঙ্গকে ক্ষয়ের হাত থেকে রক্ষা করে। দেহে পুষ্টিজাতীয় উপাদানের পাশাপাশি ধাতব উপাদানের ক্ষেত্রেও একটা সামঞ্জস্য নিয়ে আসে। ফলে স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটে।

বিজ্ঞানীরা এক পর্যায়ে এই থেরাপির ফলে ভিটামিন সি ও ই, সেলেনিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ, জিঙ্ক, বেটা ক্যারোটিনসহ অন্যান্য উপাদানের সংযুক্তি সম্পর্কে ওয়াকেবহাল হলেন তখন এসবের বায়োলজিক্যাল এন্টিঅক্সিডেন্ট উপাদান বিষয়ে নতুন করে ভাবনাচিন্তা করলেন। এইসব গবেষণার ফল এলো ইতিবাচক এবং এন্টিঅক্সিডেন্ট সংক্রান্ত বিবেচনায় চীলেশানথেরাপির গ্রহণযোগ্যতা প্রতিষ্ঠিত হলো। আরও উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো এই থেরাপি কেবল হৃদযন্ত্রের আশেপাশের ধমনীর জন্যেই কার্যকর ভূমিকা রাখে না; দেহের অন্যান্য অংশের ধমনী, এমনকি হাত-পায়ের আঙুল এবং মস্তিষ্কের ধমনীর জন্যেও উপকার বয়ে আনে।

প্রতি বছর ৬০ হাজারের মতো মানুষ তাদের পা হারায় গ্যাঙগ্রিনে, ধমনীতে ব্লকেজ সৃষ্টি হয়ে। সেট্রাক করে মারা যায় বহু লোক। ঘাড়-মাথা-পায়ের ধমনীতে বাইপাস সার্জারি এখন সাধারণ বিষয় হয়ে গেছে। এর প্রতিটি ক্ষেত্রে কম খরচে ও ঝুঁকিহীনভাবে চিকিৎসা করতে পারে চীলেশানথেরাপি।
তেমন কোনো লক্ষণই নেই কোনো মারাত্মক ব্যাধির, কিন্তু পরিবেশগত বিপর্যয়, বংশানুক্রমে পাওয়া রোগ, ধূমপান, অতিভোজন, এবং জীবনধারার কারণে প্রৌড়ত্বে এসে কোনো একটা ব্যাধি শরীরে বাসা বাঁধতেও পারে। তাই সাবধান থাকা জরুরি। জৈবিক কোনো সীমাবদ্ধতার কারণে কোনো স্বাস্থ্য সংক্রান্ত প্রোগ্রামে অংশ নেয়ার ক্ষেত্রে জটিলতা না থাকলে আপনিও নিজেকে ভয়ংকর কিছু রোগের হাত থেকে বাঁচিয়ে রাখতে পারেন এই আগাম থেরাপি গ্রহণের মাধ্যমেই। রোগগুলো হলো : ডায়াবেটিস, আর্থিরাইটিস, পারকিনসন্স, আলঝ্যাইমার, অ্যাথেরোসক্লেরোসিস, এমনকি ক্যান্সার। বার্ধক্যজনিত রোগ আলঝ্যাইমারে ভোগেন মধ্য আশির ব্যক্তিগণ। বড় ক্ষতির আগে প্রতিরোধ গ্রহণই কি বুদ্ধিমত্তার পরিচয় নয়? তাই নির্দ্বিধায় গ্রহণ করুন চীলেশানথেরাপি। চীলেশানএকটি যুগান্তকারী দীর্ঘায়ু দানকারী চিকিৎসা পদ্ধতি যা অনেকগুলো বার্ধক্যজনিত ব্যাধির বিরুদ্ধে আগেভাগেই আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ

টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Note: All are Not copyrighted , Some post are collected from internet. || বিঃদ্রঃ সকল পোস্ট বিনোদন প্লাসের নিজস্ব লেখা নয়। কিছু ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহীত ।