অবাক লাগলেও এমনটাই ছিল তাঁর অভিব্যক্তি৷ সুপারস্টার দেব৷ এই প্রথম নিজের ইমেজ ভেঙে অন্য এক অভিমুখের যাত্রী তিনি৷ অন্তরঙ্গ সাক্ষাত্কারে ‘চাঁদের পাহাড়’-এ উত্তরণের ইতিবৃত্ত৷ যা তিনি ভাগ করে নিলেন তাঁর অগণিত ভক্তর সঙ্গে৷
 তোমাকেই কেন বেছে নেওয়া হল এ ছবির জন্য?
 কেউ বলছে আমার ‘লুক’, ‘ফিজিক’-টাও কারণ হিসেবে দেখছেন কেউ কেউ! আমি কিন্ত্ত বলব ডেস্টিনি৷ যাকে বলে, নিয়তি নির্ধারিত৷
 ডেস্টিনি-ই বটে! কলকাতা থেকে আফ্রিকার ভয়ঙ্কর জঙ্গলে৷ কিন্ত্ত শুধুই কি ডেস্টিনি? তোমার ট্র্যাক রেকর্ডটাও তো একটা ব্যাপার৷ কিন্তু এই আলোচনায় যাওয়ার আগে অন্য একটা প্রশ্ন, তুমি নিজে কি এই ছবিটাকে তোমার অন্যান্য ছবির থেকে আলাদা মনে করো?
 আলাদা তো বটেই৷ আমি তুলনা করতে গিয়ে এটা বলব না যে, সো-কলড কমার্সিয়াল ছবিগুলোকেও সফল করে তোলা খুব সহজ ব্যাপার৷ পার্থক্যটা অন্যত্র৷ ‘চাঁদের পাহাড়’ একটা ক্লাসিক অ্যাডভেঞ্চার গল্প৷ ছোটবেলায় বইটা পড়েছি, তখনই তো দারুণ রোমাঞ্চকর মনে হয়েছিল৷ বাংলা সাহিত্যে এমন আর একটাও নেই৷ স্কুলে পাঠ্যবইয়ের সিলেবাসেও এর একটা অংশ অন্তর্ভুক্ত ছিল বলে মনে পড়ছে৷ সে তো এমনি এমনি নয়৷ এই গল্পটার মধ্যে শুধু রোমাঞ্চ নয়, ভয়কে জয় করার, দুর্গমকে গমনযোগ্য–আরও গভীরে গিয়ে বলা যায় একজন মানুষের নিজেকে অতিক্রম করার ব্যাপারটাও রয়েছে৷ সব মিলিয়ে দারুণ ইন্সপায়ারিং৷ এটা তো একটা কারণ৷ এ ছাড়াও ‘চাঁদের পাহাড়’ নির্মাণের যে পরিকল্পনা ও প্রয়োগ সেটাও তো বাংলা ছবির পক্ষে যথেষ্ট আলাদা৷ ১৫ কোটি টাকা বাজেটে বাংলা ছবি এই প্রথম৷ পুরোটাই শ্রীভেঙ্কটেশ ফিল্মস আমাকে দেখে লগ্ণি করেছেন৷ এটা নিয়ে বিশেষ ভাবনা বা দায়িত্বটা তো অস্বীকার করা যাবে না৷ আর ছবির প্রেক্ষিত এবং সেই অনুসরণে যে মেকিং– সবটাই তুলনীয় হবে হলিউডের ছবির সঙ্গে৷ ওখানকার ‘সুপার হিরো’ বেসড যে ছবিগুলো হয়, ‘চাঁদের পাহাড়’ দেখে দর্শক সেই সব ছবির সঙ্গে তুলনা করবেন৷ সুতরাং এর ব্যাপ্তিটা সেই দিক থেকে অনেক বেশি! আর চরিত্রটার কথা যদি বলি, সেও তো অসাধারণ৷ একটা গ্রামের ছেলে, স্বপ্ন দেখতে ভালবাসে৷ সেই স্বপ্ন মোটেই গতানুগতিক নয়! বিশ্বভ্রমণের স্বপ্ন চোখে মেখে বেরিয়ে পড়ে সে৷ এমন একটা চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পাওয়াটাই তো বিরাট ব্যাপার৷ আর যখন কাজটা শেষ হল, তখন তো আরও বুঝলাম, কেন এ ছবি আমার জন্য সব কিছুর থেকে আলাদা৷
 কঠিনতম পরিশ্রম, অন্তহীন চ্যালেঞ্জ, প্রতি মুহূর্তে রিস্ক ফ্যাক্টর–‘চাঁদের পাহাড়’-এর সামগ্রিক অভিজ্ঞতা তো এমনটাই, তাই না?
 একটা কথা এর জবাবে বলব, সেটা হল, সব ছবিই কিন্ত্ত পরিশ্রমসাপেক্ষ৷ সব ছবির জন্য সমান ঘাম-রক্ত ঝরাতে হয়৷ সবাই সাফল্যটা দেখে, তার পিছনে যে অব্যক্ত ইতিহাস থাকে, সেটা ক’জন জানতে পারে? প্রতি মুহূর্তে ভাবতে হয় কোথায় ব্যালান্স রেখে আমায় কোন অভিব্যক্তিটা দিতে হবে৷ অঙ্ক কষে নিতে হয়, কোথায় দর্শক সিটি মারবেন, কোথায় হাততালি দেবেন আর কখন কান্নায় ভেঙে পড়বেন বা নায়িকার সঙ্গে আমার রোমান্সিং দেখে নিজেদের আমার জায়গায় রাখবেন! এইগুলো না বুঝলে মানুষের মন পাওয়া যায় না৷ আমার স্টাইল, লুক, ড্রেস তখনই তো কপি করবে ফ্যানরা, যখন পর্দায় তারা আমাকে নিজেদের আইডল হিসেবে দেখবে! এই পুরোটাই যথেষ্ট কষ্টসাধ্য, সহজে হয় না৷ আর একটা ব্যাপার ‘চাঁদের পাহাড়’-এর শঙ্করের মতো এই চরিত্রগুলো ‘অথর ব্যাকড’ নয়, কাল্পনিক এক চরিত্র হয়ে পর্দায় চূড়ান্ত হিরোইজম–কোথাও কম চ্যালেঞ্জিং নয়৷ এটাও বলব, এই যে ১৫ কোটির বাজেট, এটাও আসত না ‘পাগলু’ বা ‘রংবাজ’-এর মতো ছবি না হলে৷ এই ছবিগুলো ব্যবসা দিয়েছে বলেই প্রযোজকেরা ‘চাঁদের পাহাড়’-এর মতো একটা ছবি তৈরির রিস্ক
নিতে পেরেছেন!
সত্যি তাই৷ অনেকগুলো হিট ছবির পরই একটা ‘চাঁদের পাহাড়’ তৈরি সম্ভব! এ প্রসঙ্গে একটু শুরুর দিকের আলোচনায় চলে যাব৷ তুমি বলেছিলে, ওঁরা তোমার উপর ভরসা করেছেন–
 হ্যাঁ৷ এটা সত্যি বলার মতোই৷ কমলেশ্বরদা যে দু’টি ছবি এর আগে তৈরি করেছেন, ‘উড়ো চিঠি’ বা ‘মেঘে ঢাকা তারা’– ‘চাঁদের পাহাড়’ দুটো থেকেই আলাদা৷ আবার আমিও যে ধরনের ছবিতে অভিনয় করি সাধারণত, এটা সেই ঘরানারও নয়৷ অর্থাত্‍ সব মিলিয়েই প্রযোজকদের ভরসাটা আমার কাছে বিরাট এক দায়িত্বের ব্যাপার৷ মাল্টিস্টারার ছবিও তো নয়, একা আমি ‘হিরো’– ভারটা সত্যি ওজনদার৷ এটা আমাদের সবার ড্রিম প্রোজেক্ট৷ ছবিটা দেখে রাজীব (পরিচালক, আমার বন্ধু) দারুণ প্রশংসা করে বলেছে, ‘এ ছবিকে কেউ আটকাতে পারবে না’৷ শুনে ভাল লেগেছে৷ মনে হয়েছে প্রযোজক-পরিচালককে কিছুটা হলেও ফিরিয়ে দিতে পারব৷ আমরা খুব বেশি প্রচারও করিনি, গত ১৪ নভেম্বর একটাই প্রমোশন হয়েছে৷ ব্যস! তবু এ ছবি ঘিরে মানুষের আগ্রহের উত্তাপ বেশ টের পাচ্ছি৷
সে তো হবেই৷ তোমার ভক্তের সংখ্যা তো অগুন্তি৷ মজার কথা হল শুধু টিন বা ইয়ং নয়, বাচ্চারাও তোমার দারুণ ভক্ত!
(হেসে) তা ঠিক৷ এটা সত্যি আমার জন্য খুব ইন্সপায়ারিং৷ ওরা তো আসবেই, সঙ্গে বাবা-মাকেও টেনে আনবে৷ আর এর পর বড় হলেও তো থাকবে ওরা আমার সঙ্গে৷ অর্থাত্‍ একটা লং টার্ম বন্ডিং৷
এই ‘ছোটরা’ এবং তাদের বাড়ির বড়রা যে শঙ্করকে পছন্দ করবেই, তা তো মোটামুটি বোঝাই যাচ্ছে! ‘শঙ্কর’ হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াটাও নিশ্চয়ই তোমার নিজের কাছে ততটাই মনে রাখা হয়ে থাকার মতো হল?
 নিজেকে ভুলে যাওয়াটা ছিল সব থেকে জরুরি৷ আমি ‘দেব’ নই, শঙ্কর৷ এখানে লোকে ‘পাগলু’, ‘খোকাবাবু’ বা ‘রংবাজ’-কে দেখতে আসবে না৷ তুলনাটা ইন্ডিয়ানা জোন্স, ব্যাটম্যান, স্পাইডারম্যান গোত্রের সুপারহিরোর সঙ্গে হবে৷ এক বছর পাগলের মতো খেটেছি৷ একদিকে কমলেশ্বরদা–অসাধারণ স্ক্রিপ্ট৷ লোকেশন নিয়ে প্রবল খুঁতখুঁতুনি–যে প্রপগুলো ব্যবহার হয়েছে, সেখানেও নো কমপ্রোমাইজ৷ সেক্ষেত্রে নিজেকে সুপারস্টার ভাবার প্রশ্নই নেই৷ এ প্রসঙ্গে একটা কথা বলবই, এছবি আমার ভিতরের ‘আমি’কে চিনতে অনেকটাই সাহায্য করেছে৷ পয়সা আছে খাবার নেই৷ দিনের পর দিন প্রায় একই খাবার, ‘স্টক’-এ যা আছে, খেয়ে যাচ্ছি৷ কেন না ৪০০ কিলোমিটারের মধ্যে কোনও হোটেল নেই৷ ফোনে নো নেটওয়ার্ক৷ ফোনের কাজ ঘড়ির অ্যালার্ম, ভোরে কলটাইমে রেডি থাকার জন্যে৷ অর্থাত্‍ বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে পুরো যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন্৷ জীবনযাপন কত দূর পর্যন্ত কঠিন হতে পারে, তার একটা সম্যক ধারণা হল এই ছবির শুটিং করতে গিয়ে৷ আফ্রিকার জঙ্গলে, ভয়ঙ্কর তার পরিবেশ, সে তো জানাই৷ আবহাওয়াটাও অদ্ভুত– কখনও প্রবল গরম, কখনও প্রচন্ড ঠান্ডা৷ মানিয়ে নিতেই হবে৷ পাহাড়ে উঠতে গিয়ে পড়ে গেলাম, হাতে ব্যথা পেলাম৷ পরদিন আবার শুটিং৷ নিজেকে সব সময় বলেছি, ‘কী করে করব কাজটা’ নয়, ‘কাজটা করতেই হবে’! হার মানার পাত্র আমি নই, এটা ঠিক– তবে এখানে জয়টা সত্যি কঠিন ছিল!
 হার মানার পাত্র যে তুমি নও, সে তো আজ প্রমাণিত৷ আর সেই জন্যই তো বডি ডাবল না নিয়ে সব কটা স্টাণ্ট ও অ্যাকশন করেছ!
 উ: বডি ডাবল আমি কখনওই নিই না৷ কী হবে? দেখতে তো আলাদা করে কিছু বোঝা যাবে না৷ আমি নিজে করলে অনেক বেশি স্মার্ট ও রিয়ালিস্টিক হবে ব্যাপারটা! এখানে শুরু থেকেই এটা ঠিক ছিল, সব স্টাণ্ট নিজেই করব৷ রিস্ক নিয়েছি প্রচুর, সত্যি, তবে উতরেও গেছি, এটাই বড় কথা৷ অনেক না ভোলা অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরেছি৷
 তার অন্যতম একটা নিশ্চয়ই লায়ন সিকোয়েন্সটা?
 উঃ৷ এটা সত্যি চিরদিন মনে থাকবে৷ মৃত্যুকে যদি একবারে সামনে থেকে দেখি, সেই অনুভূতিটা কেমন হতে পারে যদি বলি, এটা ছিল তাই৷ হিসেবের একটু গোলমাল হলেই, মৃত্যু থাবা বসাবে! আমার মনে হয় এই হাড় হিম করা রুশ্বাস ব্যাপারটা দর্শকও ফিল করবেন৷ বলে বোঝানো সত্যি অসম্ভব! পুরো পরিবেশ, কাজ, দিনযাপন– সবটাই অভাবনীয়, অভিনব ও অনির্বচনীয়৷chander-pahar
 তোমার বিদেশি কো-স্টারদের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতাও নিশ্চয়ই দারুণ!
লাবণীদি, তমাল রায়চৌধুরির কথা আগে বলি৷ ওঁরা তো এখানকার৷ আমার মনে হয়, শুধু নায়ক-নায়িকা নয়–একটা ছবি ভাল ও সফল হওয়ার ক্ষেত্রে সবগুলি চরিত্রের মধ্যেই যথাযথ একটা রসায়ন গড়ে ওঠা দরকার৷ এঁদের সঙ্গে এটা খুব শক্ত ছিল না, যেহেতু আগের চেনা৷ আফ্রিকার অভিনেতাদের ক্ষেত্রে আমি বিশেষ করে বলতে চাই জেরার্ডের কথা৷ জেরার্ড রুডল্ফ, যিনি দিয়েগোর চরিত্রটাতে অভিনয় করেছেন৷ দিয়েগো আলভারেজা অর্থাত্‍ যাঁর সঙ্গী হয় শঙ্কর তার দুর্গম যাত্রায়৷ তাদের দু’জনের দেখা হওয়া থেকে একসঙ্গে জার্নি– এছবির অনেকটা জুড়ে৷ জেরার্ডের কথায় ফিরি৷ অসাধারণ একজন অভিনেতা, তেমনই প্রাণবন্ত মানুষ৷ উনি তো ওখানকার বেশ বড় মাপের একজন স্টার৷ লোকজন ভিড় জমাত ওঁকে দেখার জন্য৷ খুব বন্ধুভাবাপন্ন্৷ আমরা সব সময় আলোচনা করে কাজটা করতাম৷ ভাবনার আদানপ্রদান চলত অবিরত৷ মনে পড়ছে দিয়েগোর মৃত্যুদৃশ্যটা–আমি সত্যি সত্যি কেঁদে ফেলেছিলাম৷ এতটাই অ্যাটাচমেণ্ট হয়ে গিয়েছিল ওঁর সঙ্গে দিন-রাত থাকতে থাকতে৷ দৃশ্যটা টেকের পর সবাই হাততালি দিয়ে উঠেছিল৷ ওঁর মুখে একটা বাংলা ডায়ালগও রয়েছে, যেখানে উনি শঙ্করকে বলছেন, ‘ঈশ্বর তোমার মঙ্গল করুন’৷ জানিয়েছেন বাংলা ছবিতে কাজ করার ইচ্ছে৷ ওঁর সঙ্গে সম্পর্কটা কোনওদিন ভোলার নয়৷
 এতখানি দেওয়ার পরও যখন কেউ কেউ বলে, ‘চাঁদের পাহাড়’-এ দেব? তখন নিশ্চয়ই কষ্ট হয়!
 উ: না হয় না৷ প্রশংসা, ভালবাসা আমাকে প্রেরণা জোগায়৷ আর সমালোচনা মোটিভেট করে৷ আমাকে নিয়ে ভাবেন বলেই না ওঁরা সমালোচনা করেন৷ আমি আশা করি আরও অন্তত কুড়ি বছর আমায় নিয়ে সমালোচনা হোক৷ যাতে প্রতি ছবিতেই আমি নিজেকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে পারি৷
 কুড়ি বছর তো তুমি থাকছই৷ তোমার খুদে ফ্যানরা, এই যাদের প্রসঙ্গে তুমি বললে, লম্বা বন্ডিং! কিন্ত্ত এছবি নিয়ে শেষ প্রশ্ন–নাচ-গান-ফাইটিং-রোমান্স কিছু নেই এই ‘দেব’-কে তাঁর ভক্তরা চিনতে পারবে তো?
 উ: দেব নয়৷ সবাই শঙ্করকে দেখুক, এটাই আমি চাই৷ সবাইকে আমার অনুরোধ, আপনারা ছবিটা দেখুন৷ আমাদের ইনভলভমেণ্টটা ফিল করুন৷ একটা অসাধারণ সৃষ্টিকে সেলুলয়েডে কীভাবে এনেছি আমরা সবাই মিলে, আপনারাও তার শরিক হয়ে উঠুন৷ আমি সত্যি আমার কথা ভাবছি না৷ আমি শুধু ‘চাঁদের পাহাড়’-এর কথা ভাবছি৷ এছবি আমার অভিনয়ের অন্য অভিমুখ খুলে দেবে, বলছেন অনেকেই৷ জানি না৷ তবে আশা করি, শঙ্কর হয়ে ওঠায় দেবের সততাকে সবাই মূল্য দেবেন!

টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Note: All are Not copyrighted , Some post are collected from internet. || বিঃদ্রঃ সকল পোস্ট বিনোদন প্লাসের নিজস্ব লেখা নয়। কিছু ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহীত ।