বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রসেনজিত্‍ চট্টোপাধ্যায়ের সাক্ষাত্কারে পড়েছি “গৌরব পাণ্ডের সি্প্টটাই এত ভাল লেগেছিল যে অঞ্জনিপুত্র হতে কোনও দ্বিধা করিনি৷ চিত্রনাট্য বেশ জোরালো!” অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতেই হচেছ ‘শুকনো লংকা’র চিত্রনাট্যকারের কলম থেকে ‘হনুমান.কম’-এর মতো এতো অপরিণত আলগা বাঁধুনির চিত্রনাট্য আশা করা যায় না৷ হ্যাঁ, কাহিনির মধ্যে অভিনবত্ব আছে, ‘কম্পিউটার’ নিয়ে আশা-আকাঙ্ক্ষার কথাও আছে৷ কম্পিউটার ভীত অজ-গ্রামের একজন অঙ্কের মাস্টারমশাই ভার্চুয়াল এবং রিয়েলের মধ্যে ‘তফাত্’ করে উঠতে পারেন না৷ অথচ চ্যাটিং-এ বসে তাঁর ভার্চুয়াল ফ্রেন্ডকে কম্পিউটার-পর্দায় খুন হতে দেখে খুনিকে ধরতে জমি বেচে চলে যান সোজা আইসল্যান্ডে! ভাবনা ও কল্পনার এই উল্লম্ফন ভাল লাগলেও যুক্তি ও বুরি বাইরে থেকে যায় প্রায় সবটাই৷ গৌরব কী নিজেই ভার্চু্যয়াল ও রিয়েল ওয়ার্ল্ডের পার্থক্যটা ধরতে পারেননি! নইলে এমন অগোছালো চিত্রনাট্য লিখলেন কীভাবে?prosenjit

ঘরোয়া স্ত্রী মৌসুমীকে নিয়ে প্রসেনজিতের মোটামুটি সুখ-শান্তির সংসার৷ হঠাত্ই সেখানে ঢুকে পড়ে এক ‘কম্পিউটার’৷ সরকারি নির্দেশে গ্যাঁটের পয়সা খরচ করে কম্পিউটার স্যাভি হতেই হবে যে স্কুল মাস্টারদের! ঘরে কম্পিউটার বাক্স ঢোকার পরেই আবির্ভাব টিভি মেকানিক পাঁচুর (রুদ্রনীল)৷ এই পাঁচু-ই অঞ্জনিপুত্রকে হাতেখড়ি দেয় ফেসবুক-চ্যাটিং ইত্যাদির ভার্চুয়াল ফাঁদের৷ আর সেই ফাঁদে পা দিয়েই শুঁয়োপোকা অঞ্জনিপুত্রের প্রজাপতি হবার স্বপ্ন-বাসনা জাগে৷ শুরু হয় তরুণী স্ত্রীকে অবহেলা করে রাত পেরিয়ে আইনস্টাইনের থিয়োরি তো বটেই, সঙ্গে ফেসবুক বান্ধবীর সঙ্গে চ্যাটিং৷ আর এই চ্যাটিং করতে করতেই একরাতে সে দেখে ফেলে বান্ধবীর ‘খুন’ হওয়া৷ পরের ঘটনাতো শুরুতেই বলেছি৷
কিন্ত্ত পরিচালক গৌরব পাণ্ডে বসিরহাটের অজ-গ্রামের মাস্টারমশাইকে কীভাবে পাসপোর্ট বানানো, আইসল্যান্ডের ভিসা যোগাড়ের কোনও ঝক্কি পোহাতে দিলেন না৷ এ যেন হাতে সুটকেশ ঝুলিয়ে বসিরহাট থেকে কলকাতায় বেড়াতে আসা! ক্যামেরার সামনে একটা শট-এ প্রসেনজিত্কে ঘাসে ঢাকা ময়দানে হাঁটতেও দেখা গেল৷ পরের শট-ই আইসল্যান্ডের কেপলা-ভিক এয়ারপোর্ট৷ হনুমান টুপি চাদরে ঢাকা চেহারার সঙ্গে ঢাউস সুটকেশটি নিয়ে জেরবার বেচারি অঞ্জনিপুত্র৷ প্রায় জনশূন্য এয়ারপোর্টে দেবদূতের মতো আবির্ভাব ঘটে বাংলাদেশি হাসান গৌরব পাণ্ডের৷ তাঁরই দয়ায় আশ্রয় পাওয়া! (ভিসা পেতে গেলে ট্যুরিস্টদেরও তো হোটেল বুকিং দেখাতে হয়, নাকি!) হাসান চরিত্রটি বেশ মজার, কিন্ত্ত মিনিট দশ পরে সে বেচারি উধাও, এসে পড়ল তাঁর মেয়ে নর্দ-নুরি৷ এরপর হাসানেরই রেস্তোরাঁয় খুনির দেখা পাওয়া, তাকে তাক করে অঞ্জনিপুত্রের বন্দুক চালানো, নর্দ-নুরির সঙ্গে সখ্যতা সবই হয় কেমন যেন গা ছাড়া ভাবে৷ কোনও রসায়ন মেলে না৷ মাঝে মাঝে চ্যাট-বন্ধু মারিয়া খুন হবার দৃশ্যটি আসে৷ রবীন্দ্রনাথের ‘মম চিত্তে নিতি নৃত্যে’ গানটিকে প্রায় প্যারডির সুরে গাইয়ে নীলাভ আলোয় মারিয়াকে দিয়ে কোরিওগ্রাফি করা হয়৷ কেন, কী উদ্দেশ্য– পরিষ্কার নয়৷ তবে ‘ইকির মিকির’ ছড়াটির ব্যবহার ভালই লেগেছে৷
কিন্ত্ত শুধু এটুকু ভাললাগা দিয়ে তো ‘হনুমান.কম’কে ভাল ছবি বলা যাবে না৷ পবনপুত্রের এই যে দেশান্তরে উল্লম্ফন–সেটা কী কোনওভাবে তাঁর সাইকোলজিক্যাল জার্নি! পরিচালকের তেমন কোনও উদ্দেশ্য থাকলেও ছবিতে সেটা স্পষ্ট হয়নি৷ বরং সহজ-সরল মানুষের একটা ‘যাত্রা’ই মনে হয়েছে! মাইনাস তাপমাত্রায় মাঝে মাঝেই অঞ্জনিপুত্রকে ক্যামেরার সামনে একা বসিয়ে রাখার কারণটাই বা কী! সবটাই কেমন উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যহীন! হ্যাঁ, আইসল্যান্ডের চোখভরানো দৃশ্যগুলো ভালই লাগে! কিন্তু…৷
গৌরব পাণ্ডে হয়তো বা এক গভীর দর্শনের কথা জানাতে চেয়েছিলেন৷ হনুমান চালিশা পাঠ করা, পাক্কা গৃহী অঞ্জনিপুত্রের মানসিক ও দার্শনিক কোনও উত্তরণের পর্ব দেখাতে চেয়েছিলেন৷ কিন্ত্ত, পুরো ছবিতে সেই গভীর বোধের কোনও ইমেজারি নেই৷ সিনেমা মাধ্যমটি নিয়ে তেমন কোনও পরীক্ষাও দেখা গেল না৷ হতাশা এখানেই৷
ছবির একমাত্র প্লাস পয়েণ্ট প্রসেনজিত্‍ চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয়৷ প্রথমদিকে নির্বিবাদী, সরল, সুখি গ্রামের এক মাস্টারের চরিত্রের সারল্য প্রকাশে তিনি যেমন সাবলীল৷ পরবর্তী অংশে বিদেশ-বিভূঁয়ে গিয়ে তাঁর অস্বস্তি, জড়তা, অস্বাচ্ছন্দ্যও সুন্দর বেরিয়ে এসেছে৷ প্রয়োজনে প্রসেনজিত্‍ যে নিজেকে ভেঙে চুরে ‘অনন্য’ হয়ে উঠতে পারেন, তা আবারও প্রমাণ করলেন৷ স্ত্রী তনু হয়েছেন মৌসুমী ভট্টাচার্য৷ মন্দ নন তিনি, অন্তত লুক-এ৷ তবে অভিনয় নিয়ে আরও চর্চা প্রয়োজন৷ রুদ্রনীলের পাঁচু ঠিকঠাক রুদ্রনীল ঘরানারই৷ নুরি চরিত্রে শালিনী পাণ্ডে ফুরফুরে হাওয়ার মতো৷ হাসানের চরিত্রে গৌরব নিজে কিন্তু বেশ পরিপাটি! আহা, পুরো ছবিটা যদি তেমন হতো!

টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Note: All are Not copyrighted , Some post are collected from internet. || বিঃদ্রঃ সকল পোস্ট বিনোদন প্লাসের নিজস্ব লেখা নয়। কিছু ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহীত ।