‘গান গাওয়াটা আমার কাছে এক পবিত্র মন্ত্র’’ – সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে এভাবেই বললেন ইটালিয়ান রক গায়িকা গিয়ানা নানিনি। ‘‘গান গাইতে গাইতে আমি যেন মোহাচ্ছন্ন হয়ে পড়ি। গান আমাকে সুখী করে এবং আমার আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়।’’Gianna-Nannini

ফ্রাঙ্কফুর্টে বসবাসকারী সুইস সঙ্গীত বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানী মারি স্পিশিগার বলেন, ‘‘সঙ্গীত ও ধর্ম একই শেকড় থেকে আসা। এ দুটিই এমন এক অনুভূতি জাগায়, যা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। এটি এমন এক অভিজ্ঞতা যা নিত্যদিনের সবকিছুকে ছাড়িয়ে যায়।” ভক্তরাও তার গানের সেই আনন্দ স্রোতে অবগাহন না করে পারেন না। অবশ্য তিনি জোর দিয়েই বলেন, ‘‘আমি কিন্তু ধার্মিক নই।”

যেন স্বর্গীয় দূতের ডানা ঝাপটানো

সঙ্গীতের আধ্যাত্মিক শক্তি মানব ইতিহাসের সেই শুরু থেকে আজ পর্যন্ত বিরাজমান। এই একবিংশ শতাব্দীতে এসেও তবলচি ও বাদকরা আগের মতো একই ধরনের ঢাকঢোল ও বাঁশি বাজান। অবশ্য আদিবাসী মানুষের কাছে সঙ্গীত আজও কোনো বিনোদন নয়, বরং এর মাধ্যমে তারা ঈশ্বরের সান্নিধ্য পেতে চেষ্টা করেন।

খ্রিষ্ট ধর্মেও সঙ্গীত সবসময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। গ্রেগরিয়ান গানের পালা থেকে বাখ সঙ্গীত হয়ে গসপেল পর্যন্ত সঙ্গীতের সব ধারাতেই উঠে এসেছে ধর্মীয় কর্মকাণ্ড, উৎসব ও ধ্যান ধারণা।

পাডেরবর্ন-এর সংগীত মনোবিজ্ঞানী হাইনের গেমব্রিস তাই এ বিষয়টির উপর জোর দিয়ে বলেন, ‘‘সংগীত যেন স্বর্গীয় দূতের ঝাপটানো ডানা, যা আমাদের মন ছুঁয়ে যায়। যার মাধ্যমে আমরা বিশাল কোনো কিছুর উপস্থিতি অনুভব করতে পারি। আর এই বিশালত্ব আমাদের নিজস্ব গণ্ডি থেকে বের করে আনতে পারে, ছড়িয়ে দিতে পারে সারা বিশ্বে।”

ধর্ম ছাড়াই আধ্যাত্মিকতা

ধর্মনিরপেক্ষ পশ্চিমা জগতে সঙ্গীতের ভূমিকা অনেকটা পশ্চাত্পটে চলে এসেছে। এককালে উপাসনা ও ধর্মীয় রীতি-নীতির মাধ্যমে মানুষের মনে যে অনুভূতির সঞ্চার হতো, তা আজ নানা ধরনের কনসার্টের মাঝে খুঁজে পেতে চেষ্টা করে তারা। আজকের তরুণদের কাছে তারকা শিল্পীরাই যেন আধ্যাত্মিক জগতের সাধু, সন্ত। তাদের সঙ্গীতেই আনন্দ ও সান্ত্বনা খোঁজে তারা।

সঙ্গীত বিশেষজ্ঞ মারিয়া স্পিশিগার বলেন, ‘‘সঙ্গীতের সুরে স্বর্গীয় সুধার আবেশ মানুষ খুব সহজে পায় না। নিজের সংস্কৃতির ভাণ্ডার থেকে এটি খুঁজে নিতে হয়। অনেকের কাছেই সঙ্গীতের রয়েছে বিশেষ গুরুত্ব। তারা এর মাঝে জীবনের অর্থ ও যৌক্তিকতা খোঁজে। আবার কেউ কেউ সঙ্গীতের মাধ্যমে ধর্মীয় আকাঙ্ক্ষা মেটায়।”

রয়েছে ধ্বনির উন্মাদনা

একই মত পোষণ করেন ৩৬ বছর বয়সী এলিজাবেথ ডিক-এর মতো সঙ্গীত ভক্তরা। তিনি বলেন, ‘‘আগে আমি ‘এনিগমা’ পছন্দ করতাম। ব্যান্ডের কোমল সুরের গানগুলো আমার কাছে পুরোপুরি স্বর্গীয় বলে মনে হতো। আমার এমন এক অনুভূতি হতো, যেন আমি অন্য জগতে ভাসছি।”

এখন অবশ্য তিনি রক কনসার্টে বেশি যান। এ সম্পর্কে এলিজাবেথ বলেন, ‘‘এক্ষেত্রে কারো ভাবা ঠিক হবে না যে, সেখানে আধ্যাত্মিক কিছু আছে। কিন্তু শত শত ভক্ত যখন আনন্দ-উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠে, তখন নিজেকেও তাদের সাথে মিলিয়ে দিতে ইচ্ছা করে। তখন আমি যেন মোহমুগ্ধ হয়ে পড়ি।”

টেকনো পার্টিগুলিতেও এই রকম আবহ সৃষ্টি হয়। সেখানে তরুণরা ছন্দের তালে তালে এক উন্মাদনায় দুলতে থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে, এটি স্নায়ুতন্ত্রের মাধ্যমে সারা শরীরেই প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। ফলে কয়েক ঘণ্টা নাচতে থাকলে সবাই একরকম মোহে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে।

ধর্মের বিকল্প সঙ্গীত

এভাবে শুধু সংগীত তারকারাই নয়, বরং ডিস্কজকি বা ডিজেরাও এক ধরনের ধর্মীয় মডেল বা আদর্শে পরিণত হচ্ছেন। তরুণরা এখন এই সব শিল্পীকে অনুকরণ করে নিজেদের গড়ে তুলতে চাইছে। তাই তো এই ধারার সাথে তাল মিলিয়ে মার্কিন শিল্পী ‘পিঙ্ক’ ‘গড ইজ এ ডিজে’ শিরোনামের গান করে দারুণ হিট করেছেন।

পছন্দের তারকা বা শিল্পীর কনসার্টগুলোতে ভক্তরা একে অন্যের সঙ্গে এক ধরনের একাত্মতা অনুভব করেন। তাদের চালচলন, পোশাক-আশাক ও অলংকার একই রকমের হয়। এক ধরনের ফ্যানগ্রুপ গড়ে তোলেন তারা। আর এই ভাবে সঙ্গীতের অন্যান্য ধারার অনুরাগীদের কাছ থেকে সচেতনভাবেই নিজেদের আলাদা করতে চান ভক্তরা।

টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Note: All are Not copyrighted , Some post are collected from internet. || বিঃদ্রঃ সকল পোস্ট বিনোদন প্লাসের নিজস্ব লেখা নয়। কিছু ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহীত ।