2013-02-05-19-11-18-511159560ea07-11আরাম করে চেয়ারে বসে ভাবছেন, কী শান্তি! কিন্তু এই চেয়ারই হতে পারে আপনার অশান্তির কারণ। বিশেষ করে যাঁদের কাজের কারণে দীর্ঘ সময় চেয়ারে বসে থাকতে হয়, তাঁদের ক্ষেত্রে চেয়ার বন্ধু নয়, শত্রু। প্রতিদিন সকালে দৌড়ান বা জিমে যান, সেটা কাজে দেবে না যদি বাকি দিনের বেশির ভাগ সময় বসে কাটে। সেটা হতে পারে গাড়িতে, অফিসের চেয়ারে, পড়ালেখার টেবিলে কিংবা বাসার সোফায়। বহু কারণে দিনের বেশির ভাগ সময় অনেককেই বসে কাটাতে হয়। হয়তো ভাবছেন, এর জন্য আবার গুরুতর কী সমস্যা হবে! আসলে মানবদেহের কাঠামো, বিশেষ করে মেরুদণ্ডের হাড়গুলো বেশি সময় একটানা বসে কাটানোর জন্য উপযুক্ত নয়। এ কারণেই দীর্ঘ সময় বসে থাকার পরিণতি শরীরের জন্য কষ্টদায়ক। এ ধরনের লাইফস্টাইলে অভ্যস্তদের শরীরের নানা অংশে ব্যথা অনুভূত হওয়া খুবই স্বাভাবিক। সেই সঙ্গে আছে মুটিয়ে যাওয়া, ডায়াবেটিস, হৃদরোগসহ বিভিন্ন ক্যান্সার ও অল্প বয়সে মৃত্যুর ঝুঁকি পর্যন্ত।

বসে থাকার হিসাব-নিকাশ
একবার হিসাব করে দেখুন দিনের কতটা সময় বসে কাটান। এই বসে থাকার মধ্যে রয়েছে অফিসে বা কর্মক্ষেত্রে বসে থাকা, খাওয়ার টেবিলে বসে থাকা, টিভি বা সিনেমা দেখার জন্য বসে থাকা; এমনকি মেহমানদের সঙ্গে বসে আলাপচারিতার সময়টাও। হিসাব করুন, এ ধরনের বসে থাকার মোট সময়। নিজেই চমকে উঠবেন! আরে এতটা সময় বসে বসে কাটাচ্ছি! বর্তমানে কাজের পদ্ধতি পরিবর্তনের কারণে মানুষের গড়পড়তা বসে থাকার সময় বেড়ে গেছে। ভাবলে অবাক লাগে, কিন্তু এখন মানুষ ২৪ ঘণ্টায় গড়ে ৯.৩ ঘণ্টা বসে থাকে। এটা ঘুমের (৭-৮ ঘণ্টা) সময়ের চেয়েও বেশি। ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ক্যারোলিনা এবং পেনিংটন বায়োমেডিক্যাল রিসার্চ সেন্টারের এক গবেষণায় জানা গেছে, তিন ঘণ্টা বা তার বেশি সময় বসে কাটাতে অভ্যস্তদের হার্টের অসুখে মৃত্যুর ঝুঁকি বেড়ে যায় ৬৪ শতাংশ। অনাকাঙিক্ষতভাবেই বিজ্ঞানীরা দেখতে পান, যারা দিনে অনেক সময় বসে কাটান ও হার্টঅ্যাটাকে আক্রান্ত হন তাদের অনেকেরই ব্যায়াম করার অভ্যাসও ছিল। কিন্তু ব্যায়ামের মাত্রা তাদের বসে থাকার ক্ষতিকর প্রভাব কাটাতে পারেনি। দৈহিক পরিশ্রমের পরিমাণের সঙ্গে বসে বসে কাটানো সময়ের ভারসাম্যকে তাই এখন মেডিক্যাল বিশেষজ্ঞরা গুরুত্ব দিচ্ছেন। অন্যান্য গবেষণায় দেখা যায়, বসে বসে কাটানোর সঙ্গে হৃদরোগ ছাড়াও ক্যান্সার, ডায়াবেটিস ও ওজন বেড়ে যাওয়ার সম্পর্ক রয়েছে।

যেভাবে বিপদ আসে
বসে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে পায়ের মাংসপেশির ইলেকট্রিক্যাল অ্যাক্টিভিটি বন্ধ হয়ে যায়, প্রতি মিনিটে ক্যালরি পোড়ানোর হার কমতে থাকে এবং চর্বি ভাঙতে সাহায্যকারী এনজাইমের পরিমাণ ৯০ শতাংশ কমে যায়। দুই ঘণ্টা পর দেহের ভালো কোলেস্টেরল কমে যায় ২০ শতাংশ। ২৪ ঘণ্টা পর ইনসুলিনের কার্যকারিতা ২৪ শতাংশ কমে যায় এবং ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ে। দাঁড়িয়ে কাজ করতে হয় এমন ব্যক্তিদের চেয়ে বসে কাজ করা ব্যক্তিদের হৃদরোগের ঝুঁকি দ্বিগুণ। বসে থেকে তেমন কোনো এনার্জিই খরচ হয় না শরীরে। বরং দাঁড়ানো বা নড়াচড়ার মধ্যে থাকলে শক্তি খরচ হয়। বসে থাকার প্রভাব কেবল দীর্ঘমেয়াদি নয়; বসে পড়লে শরীর নিষ্ক্রিয় অবস্থায় চলে যায়। বসে বসে মানুষ মুটিয়ে যায়। যারা দিনের অর্ধেকের বেশি সময় বসে থাকেন, তাদের ক্ষেত্রে হার্টঅ্যাটাকের প্রবণতা বেড়ে যায়, ফলে মৃত্যুর হারও বাড়ে। অনেকে আবার অসাবধানতায় ভুল ভঙ্গিতে বসে থাকেন। দীর্ঘ সময় মেরুদণ্ড বাঁকা করে বসে কাজ করলে এর ওপর সব সময় একটা চাপা টান থাকে। ফলে স্বাভাবিক রক্ত চলাচল ব্যাহত হয়ে পিঠে আর্থ্রাইটিস হয়ে যেতে পারে।

চেয়ারের ফাঁদ এড়াতে
এ সময়ে বেশির ভাগ লোককেই দিনে আট ঘণ্টা বসে থাকার কাজ করতে হয়। এর বাইরে দিনের অন্যান্য সময় বসে থাকাটাই বাড়তি ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায় স্বাস্থ্যের জন্য। দিনে অন্তত ৩০ মিনিট ব্যায়াম বা দৈহিক পরিশ্রম করার কথা প্রায়ই বলা হয়। কিন্তু শুধু এটুকুই যথেষ্ট নয়। যখনই সম্ভব বসা থেকে উঠুন। হাত-পা বা পুরো শরীর স্ট্রেচিং করতে পারেন, কাজের জায়গার মধ্যেই হাঁটাহাঁটি করতে পারেন, কিংবা সুযোগ থাকলে লাফঝাঁপ করাও মন্দ নয়। হাঁটায় বসে থাকার চেয়ে ৩-৫ গুণ বেশি ক্যালরি খরচ হয়। অফিসের আশপাশে হাঁটাহাঁটির সুযোগ মিস করবেন না। অনেক সময় ডেস্কে কিংবা গাড়িতে বাধ্য হয়েই একটানা অনেক সময় বসে থাকতে হয়। পিঠ সোজা টানটান বা ঝুঁকে বসার চেয়ে কোমরে ১৩৫ ডিগ্রি কোনা করে হেলান দিয়ে বসলে পিঠে কিছুটা কম চাপ পড়ে। চেয়ারে বসে পড়া অথবা কম্পিউটারের কিবোর্ডে টাইপ করার সময় পুরো মাথা সামনের দিকে বাঁকা না করে শুধু চোখ নিচের দিকে তাকিয়েও তা করতে পারেন। অফিসে সাধারণ কাজ করার সময় মেরুদণ্ডের কাঠামোগত দিকটি স্থিতিশীল রাখতে পিঠের নিচের দিকে একটি ব্যাক-রেস্ট কুশন বা বালিশ ব্যবহার করতে পারেন। এখন কেউ কেউ একই সঙ্গে দাঁড়িয়ে ও বসে কাজ করার উপযোগী ডেস্ক ব্যবহার করেন। এগুলো ব্যবহার করা সম্ভব হলে খুবই ভালো। কারণ যখন ইচ্ছা বসা থেকে উঠে ডেস্কটির উচ্চতা বাড়িয়ে কাজে মন দেয়া যায়।

সুস্বাস্থ্যের জন্য উঠে দাঁড়ান
মানুষের শরীর আসলে কোনোভাবেই বেশিক্ষণ বসে থাকার উপযুক্ত নয়। আজ থেকে মাত্র ১০০ বছর আগেও মানুষ যখন ক্ষেতখামার আর শিল্প-কারখানায় কাজ করত, তখন মুটিয়ে যাওয়া মানুষ সচরাচর দেখা যেত না। কিন্তু দিনের শেষ মুহূর্তেও এখন খোলা মাঠে মুক্ত হয়ে ছোটার সময় পাই না আমরা, তাই নিজের দেহকে অন্যভাবে সাহায্য করতে হবে। আমেরিকান ক্যান্সার সোসাইটির গবেষণায় জানা যায়, যারা বেশি সময় বসে না থেকে শারীরিক পরিশ্রম করে তাদের ক্ষেত্রে মৃত্যুর ঝুঁকি অনেক কম। তাই বেশি বসে না থেকে প্রতিদিন স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা বাড়ান এবং সুস্থ-সবল থাকুন। নিয়মিত ব্যায়াম করার অভ্যাস করুন। দীর্ঘ সময় বসে থাকতে হলেও বিজ্ঞানসম্মতভাবে শরীরের কাঠামোগত দিকটি সব সময় বিবেচনায় রেখে নিজের কাজ করুন। আর যখনই সময় পান উঠে দাঁড়ান।

দৈহিক পরিশ্রম করলে ওষুধ হিসেবে ভাবলে ব্যায়ামের নিরাময় ক্ষমতা বিস্ময়কর। নিয়মিত ব্যায়াম ও নড়াচড়ায় ঠান্ডা-সর্দির মাত্রা কমে যায়, এমনটাই জানিয়েছেন গবেষকরা। এর পাশপাশি-

  • স্ট্রোকের ঝুঁকি কমে ২৭ শতাংশ।
  • ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি কমায় ৫০ শতাংশ।
  • উচ্চরক্তচাপ হওয়ার ঝুঁকি কমায় প্রায় ৪০ শতাংশ।
  • ব্রেস্ট ক্যান্সারের ঝুঁকি কমাতে পারে প্রায় ৫০ শতাংশ।
  • কোলন ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায় ৬০ শতাংশেরও বেশি।
  • অ্যালঝেইমার্স হওয়ার ঝুঁকি কমায় প্রায় ৪০ শতাংশ।
  • বিষণ্নতা কমায় ঠিক যেমন কমে ওষুধ বা বিভিন্ন থেরাপি নিলে।

টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Note: All are Not copyrighted , Some post are collected from internet. || বিঃদ্রঃ সকল পোস্ট বিনোদন প্লাসের নিজস্ব লেখা নয়। কিছু ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহীত ।